মৃত্যুদণ্ড : বাতিলযোগ্য একটি দণ্ড

৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ ইন্ডিয়ান ল ইন্সটিটিউটে শাহিদ আজমি স্মারক ভাষণ দেন যুগ মোহিত চৌধুরি। সমাপতন, ওইদিনই সকালে আফজল গুরুর ফাঁসি হয়। এই বক্তৃতার সামান্য সম্পাদিত লিখিত বয়ান (দীপ্তি স্বামী, ধীরাজ পাণ্ডে, অনুরাগ শেঠির করা) কাফিলা ডট অর্গ-এ প্রকাশ হয় ১৯ ফেব্রুয়ারি। এর সামান্য সম্পাদিত বঙ্গানুবাদ করেছেন শমীক সরকার। শাহিদ আজমি স্মারক বক্তৃতা হয় আজমির বন্ধু, সহকর্মী ও ছাত্রদের উদ্যোগে, যারা তাঁর কাজ মনে রাখতে চায়। অ্যাডভোকেট শাহিদ আজমি ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১০ সালে ৩২ বছর বয়সে নিজের অফিসে গুলিতে খুন হন। খুনের সময় শাহিদ বিভিন্ন সন্ত্রাসবাদী হামলার মামলা লড়ছিলেন, যাদের মালেগাঁও বা মুম্বই হামলায় ফাঁসানো হয়েছিল, তাদের হয়ে।

… মৃত্যুদণ্ড একদিন হঠাৎ করে উঠে যায়নি, যাবেও না। প্রগতি ধীরগতিতে একটু একটু করে হয়। এবং সেটা নির্ভর করে আমরা সরকার, আদালত, সংসদ এবং মানুষকে কতটা সফলভাবে বোঝাতে পারছি যে মৃত্যুদণ্ড কোনো কাজে আসে না, বাস্তবত তা আমাদের নিচে টেনে নামায়।
আজ মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করার বিভিন্ন কারণ উপস্থিত। লোকে একে নৈতিকভাবে ভুল বলে মনে করতে পারে; লোকে ভাবতে পারে একজন হত্যাকারীকে তারই কায়দায় শাস্তি দেওয়াটা ভণ্ডামি; লোকে বলতে পারে, যাবজ্জীবনের ফলে ভবিষ্যতের একই ধরনের অপরাধে যতটা লাগাম টানা যায়, তার তুলনায় মৃত্যুদণ্ডের ফলে বেশি লাগাম টানা যায় এর কোনো প্রমাণ নেই। মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতার আরেকটা কারণ, এটা আর ফিরিয়ে নেওয়া যায় না। কিছু কিছু পরিস্থিতিতে দেখা যায় বিচারটি ভুল হয়েছে, মৃত্যুদণ্ড হয়ে গেলে তার পুনর্বিচার করা যায় না, আর কিছুই করার থাকে না, যবনিকা পড়ে যায়।
এবারে মৃত্যুদণ্ডের অবসানের পক্ষে সওয়াল করার জন্য এটাকে তিনটি সামাজিক প্রতিষ্ঠানের প্রেক্ষাপটে আলোচনা করা যাক। এই তিনটি প্রতিষ্ঠান হল পুলিশ, যা প্রমাণ সংগ্রহ করে; আদালত, যা দোষের বিচার করে এবং উপযুক্ত রায় প্রদান করে; এবং কার্যকর, যা ক্ষমার আবেদন নিয়ে নাড়াচাড়া করে।
একথা আর জোর দিয়ে বলতে হবে না, ভারতে পুলিশবাহিনীটি দুর্নীতি, অসততা আর অপরাধপ্রবণতার জন্য কুখ্যাত। আদালতে যে প্রমাণ দাখিল করা হয়, তা জোগাড় করে পুলিশ। আমরা সেই প্রমাণের ওপরে ভিত্তি করেই সিদ্ধান্ত নিই, কেউ দোষী কি না, কারোর মৃত্যুদণ্ড হবে কি না। এখানেই একটা বড়ো প্রশ্নচিহ্ন থেকে যায়, দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশ বাহিনীর জোগাড় করা প্রমাণের ওপর দাঁড়িয়ে কাউকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়াটা কি নিরাপদ? আমি কতগুলো উদাহরণ দিচ্ছি।

কয়েক বছর আগে বোম্বেতে, একজন একটি বাচ্চার ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিল এবং সাজা পেয়েছিল। হাইকোর্টে তার আবেদন যখন ঝুলে ছিল, তখন সেই মামলাটির তদন্তকারী পুলিশ অফিসার আত্মহত্যা করে। একটা সুইসাইড নোটে সে লিখে যায়, সে লোকটিকে ফাঁসিয়েছিল। এখন নথিভুক্ত প্রমাণের যা বহর ছিল তাতে লোকটির খালাস হয় না। ওই সুইসাইড নোটটি, যা কিনা প্রমাণের দস্তাবেজেও ছিল না, তা না থাকলে ওই লোকটি ফাঁসিকাঠে চড়ে যেত। বোম্বে হাইকোর্ট খুব অচিরাচরিতভাবেই ওই সুইসাইড নোটটির দিকে আলোকপাত করে এবং লোকটিকে খালাস করে দেয়। কী হত যদি ওই অফিসারের এভাবে বিবেকের দংশন না হত?
আমি আরও কিছু উদাহরণ দিচ্ছি। শাহীদ যেসব মামলাগুলি নিয়ে কাজ করছিল, যেগুলি নিয়ে আমি এখন কাজ করছি : ২০০৬ সালের মালেগাঁও বিস্ফোরণ। শবেবরাতের রাতে মুসলিম অধ্যুষিত মালেগাঁও-এর মসজিদের বাইরে বোমাগুলো ফাটে। ন-টি ছেলে গ্রেফতার হয়, এবং তার ওপর এই বোমা বিস্ফোরণের দায় চাপানো হয়। নয়জনের স্বীকারোক্তি নথিভুক্ত করা হয়। পুলিশ দাবি করে যে তারা ওদের বাড়ি থেকে আরডিএক্স, বিস্ফোরক উদ্ধার করেছে। পুলিশ আরও দাবি করে, ওই নয়জনের মধ্যে একজন বিবেকের তাড়নায় তার সহকারীদের বিরুদ্ধে গিয়ে রাষ্ট্রের হয়ে প্রমাণ দিতে রাজি হয়েছে। চার্জশিট বানানো হয়ে যায়; সেগুলো দাখিলও করা হয়। কিন্তু মুম্বইতে চেঁচামেচি শুরু হওয়ায় মামলাটির তদন্তের ভার সিবিআই-কে দেওয়া হয়। মুম্বই পুলিশের তদন্তের ফলাফলগুলিকে পুনরায় উপস্থাপন করে সিবিআই একটি পরিপূরক চার্জশিট বানায়। এবং তারপর জাতীয় তদন্ত এজেন্সি (ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি), যারা সমঝোতা এক্সপ্রেসের বিস্ফোরণের তদন্ত করছিল, তারা স্বামী অসীমানন্দকে গ্রেফতার করে। অসীমানন্দ স্বীকার করে, মালেগাঁও বিস্ফোরণটিও তারই ঘটানো। সে বলে, তার দক্ষিণপন্থী হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এই মালেগাঁও বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। এবার ওই প্রমাণগুলি, স্বীকারোক্তি, আরডিএক্স গুলির কী হবে? আরডিএক্স এল কোথা থেকে?
এবার, একজন বিচারকের জায়গায় নিজেকে দাঁড় করান, যিনি একটি মামলার বিচার করছেন। এবং পুলিশ আদালতে আরডিএক্স এনে দেখালো। বলল, এটা অভিযুক্তর বাড়ি থেকে উদ্ধার হয়েছে। আসামী পক্ষের উকিল বলল, এই প্রমাণটি সাজানো। বিচারক জিজ্ঞেস করল, পুলিশ তাহলে এটা পেল কোথা থেকে? কীভাবে এর উত্তর দেবেন? এর উত্তর দিতে গিয়ে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যেতে হয়। তাই বিচারক ওই প্রমাণের ওপর দাঁড়িয়ে বিশ্বাস করেন, ওই আরডিএক্স আসলে অভিযুক্তর বাড়ি থেকেই উদ্ধার করা হয়েছে। নাহলে আরডিএক্স এল কোথা থেকে? সাধারণ মানুষের কাছে আরডিএক্স থাকে না। কিন্তু  অসীমানন্দের স্বীকারোক্তি সামনে না এলে ওই ন-টি ছেলে হয়তো ফাঁসিকাঠে ঝুলত। সবাই। এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।
২০০৬ সালের ১১ জুলাই আধঘন্টার মধ্যে মুম্বইয়ে সাতটি ট্রেনে বিস্ফোরণ হয়েছিল। পুলিশ বিস্ফোরণ ঘটানোর অভিযোগে তেরোটি ছেলেকে গ্রেফতার করে, যারা সিমি (স্টুডেন্টস ইসলামিক মুভমেন্ট অফ ইন্ডিয়া)-র সদস্য। তাদের মোবাইল ফোনগুলি আটক করা হয় গ্রেফতারির সময়। ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে তাদের হেফাজত চেয়ে লিখিত আবেদনে পুলিশ বলে, এই মোবাইল ফোনগুলি ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে, এবং তাদের কল রেকর্ড পাওয়া গেছে মোবাইলের পরিষেবা প্রদানকারী কোম্পানির কাছ থেকে। পুলিশ দাবি করে যে কল রেকর্ড বলছে, ওই তেরোজন নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখত এই ষড়যন্ত্রের জাল বোনার জন্য। তাছাড়া, তাদের পাকিস্তানের লস্কর-ই-তৈবার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। তারা যুবকদের পাঠাত পাকিস্তানে সন্ত্রাসবাদী ট্রেনিং নেওয়ার জন্য। এসব কথা তারা একবার বলেনি, সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে বলেছে, ধৃতদের হেফাজতে নেওয়ার জন্য। একশো ঊননব্বই জন মারা গিয়েছিল ওই ট্রেন বিস্ফোরণে। কোনো ম্যাজিস্ট্রেট বা বিচারক জামিন দেবে না এই মামলায়, বিশেষত যদি পুলিশের তরফে এভাবে ফরেনসিক প্রমাণের কথা বলা হয়। এগুলো যথেষ্ট জোরালো প্রমাণ যে তুমি লস্কর-ই-তৈবার সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছ এবং সেখানে লোককে পাঠাচ্ছ সন্ত্রাসি প্রশিক্ষণের জন্য।
যদিও, কিছুদিন পরে মুম্বই পুলিশের আর একটি শাখা আরেক দলকে গ্রেফতার করে ওই একই ট্রেন বিস্ফোরণ ঘটানোর অভিযোগে। স্বীকারোক্তি নথিভুক্ত হয়। সরকার থেকে সম্মতি দেওয়া হয় একই অপরাধের জন্য এই নতুন এক দলকে চার্জশিট দিতে। সিমি-র সদস্যদের চার্জশিট যখন দেওয়া হয়, তখন তারা কল রেকর্ডের একটি কপি চেয়েছিল কারণ চার্জশিটের সঙ্গে তা ছিল না। এটা বিস্ময়কর, কারণ পুলিশ দাবি করেছিল, ওই কল রেকর্ডই দেখায়, এরা লস্কর-ই-তৈবার সঙ্গে যোগাযোগ রাখে। কেন তারা চার্জশিটের সঙ্গে কল রেকর্ডের কপি দেবে না? কিন্তু তারা দেয়নি।
ওই ছেলেগুলো সবসময় বলে গেছিল, ওই কল রেকর্ডগুলি যদি আদালতে পেশ করা হয়, সেগুলিই তাদের নির্দোষিতা প্রমাণ করবে। বাস্তবে ওই বিস্ফোরণের সময় তারা অন্য জায়গায় ছিল। মোবাইলের টাওয়ার লোকেশন পরিষ্কার দেখিয়ে দেবে, ওরা তখন চার্চ গেট রেলস্টেশনে ছিল না, যা কিনা পুলিশ দাবি করেছিল। ওদের মধ্যে একজন ছিল বিহারে, বোম্বের বাইরে। কেউ কেউ ছিল উত্তর বোম্বেতে, যা বিস্ফোরণের স্থান চার্চ গেট স্টেশনের থেকে অনেক দূরে। তাই ওই ছেলেরা টেলিফোনের কল রেকর্ডগুলো চেয়েছিল, যা তাদের নির্দোষিতার সওয়ালের সহায়ক হবে। ছ-বছর ধরে ছ-টি আবেদন করা হয় সেগুলির জন্য। কিন্তু পুলিশ ধারাবাহিকভাবে বলতে থাকে, তারা চার্জশিটটি ওই কল রেকর্ডের ভিত্তিতে তৈরি করেনি, তাই অভিযুক্তদের তারা ওই কল রেকর্ডের কপি দিতে বাধ্য নয়। কিন্তু প্রায়শই এই সন্ত্রাসি হামলাগুলির বিচারে যা হয়, এই মামলাগুলির দিকে এত নজর থাকে, এত প্রচার পায় এগুলি, বিচারকরা বেশিরভাগ সময়ই অভিযোগকারীর সমস্ত বক্তব্যে শিলমোহর লাগানোর কাজ করে। ছ-বছর ধরে ওই ফোন রেকর্ডগুলির সমস্ত আবেদন বিচারক নাকচ করে দেয়। শেষমেশ আমরা হাইকোর্টে যাই এবং ওই ফোন রেকর্ডগুলি চাই। হাই কোর্ট মনে করে, এই রেকর্ডগুলি প্রাসঙ্গিক এবং পুলিশকে বলে ওই রেকর্ডগুলি দেওয়ার জন্য। ছ-বছর পরে এবং শেষবার তারা ওগুলো দেবে না বলার তিনমাস পরে হাইকোর্টে দাঁড়িয়ে পুলিশ জানায় ওই রেকর্ডগুলি তারা নষ্ট করে ফেলেছে! পুলিশ যখন বলছে, কিছু অভিযুক্ত এখনও গ্রেফতার হওয়া বাকি, তখন তাদের পক্ষে কি এই রেকর্ডগুলি নষ্ট করা সম্ভব? যদি না এই রেকর্ডগুলির  তথ্য দেখিয়ে দিতে পারত যে এই ছেলেরা নির্দোষ?
সাধারণ অপরাধের ক্ষেত্রে, স্বীকারোক্তিমূলক প্রমাণ বিশ্বাসের যোগ্য হিসেবে ধরা হয় না। কারণ, কীভাবে আপনি একটি পুলিশ অফিসারের সমস্ত কথা বিশ্বাস করবেন? এটা বিচারের নীতি, যার মাধ্যমে স্বীকারোক্তিকে প্রমাণের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। কিন্তু গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে স্বীকারোক্তিকে প্রমাণের আওতায় আনা হয়। এটা বেশ আশ্চর্যের। যদি সাধারণ অপরাধের ক্ষেত্রে স্বীকারোক্তিকে না ধরা হয়, তাহলে কীভাবে সেটাকে ধরা হবে গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে, যেখানে প্রমাণও আরও উঁচুদরের হওয়া দরকার। কিন্তু আমাদের দেশের আইনে তাই হয়, আর এই বিশেষ আইনের আওতাতেই সন্ত্রাসবাদীদের বিচার হয়। তাই ২০০৬ সালের মালেগাঁও বিস্ফোরণের ক্ষেত্রে পুলিশ প্রমাণ হিসেবে আদালতে দাখিল করতে চেয়েছিল কেবল ন-টি স্বীকারোক্তি। কোনও বাস্তব শক্ত প্রমাণ ছিল না। আর পুলিশ অফিসারদের ভুয়ো স্বীকারোক্তি আদায় করা কোনো কঠিন কাজ নয়।
ইন্দিরা গান্ধী হত্যা মামলায় তাঁর নিরাপত্তায় থাকা একজন অফিসার বলবন্ত সিং-কে সঙ্গে সঙ্গে, বেআইনিভাবে, গ্রেফতার করা হয়। তাকে কিন্তু গ্রেফতার হিসেবে দেখানো হয়নি, পুলিশ তাকে যমুনা ভেলোড্রোমে বহুদিন বেআইনিভাবে আটকে রেখেছিল; নিষ্ঠুরভাবে অত্যাচার করেছিল ওই সময়, তারপর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। ছেড়ে দেওয়ার দু-একদিন বাদে তাকে আইএসবিটি-র একটি বাস থেকে নামার সময় গ্রেফতার করা হয়েছিল বলে দেখানো হয়। এবং পুলিশ দাবি করে, তার পকেট থেকে পাওয়া গেছে তার সম্পূর্ণ স্বীকারোক্তি। একটি চিঠির আকারে বড়ো বড়ো দাঁড়ি কমা সহ সেই স্বীকারোক্তি। এটা ইন্দিরা গান্ধী হত্যা মামলায় ঘটেছিল! ট্রায়াল কোর্ট এটা বিশ্বাস করেছিল, বলবন্ত সিং-কে মৃত্যুদণ্ড দেয়। হাইকোর্ট-ও এটা বিশ্বাস করেছিল, বলবন্তের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল।
আমি তাই আমার প্রশ্নটিতে ফেরত আসছি : এই ধরনের প্রমাণ গ্রহণ করা এবং মানুষকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া, এবং এর মধ্যে দিয়ে ভবিষ্যতের কোনো সময়ে ভুল বা ওলোটপালোট খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা নিকেশ করে দেওয়া কি নিরাপদ?
দ্বিতীয় যে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানটি মৃত্যুদণ্ডের সঙ্গে যুক্ত, তা হল বিচারব্যবস্থা। বিচারব্যবস্থা ভারতের অন্য যে কোনো প্রতিষ্ঠানের মতোই নড়বড়ে, ভুল প্রবণ। এটাও সেই ধরনের লোকজন নিয়েই গড়া, যেমন লোকজন আমাদের সমাজের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলি তৈরি করেছে। মানুষ থাকলেই ভুল হবে। এবং মৃত্যুদণ্ডের পূর্বশর্ত, অর্থাৎ, ণ্ণদুর্লভের চেয়েও দুর্লভ’, এটিও মূলগতভাবে এত মনোগত ধারণা নির্ভর যে একই বিষয়ে নানা ধরনের মতামত থাকবেই। সুপ্রিম কোর্ট এখন আত্ম-সন্ধানে ব্যস্ত এবং তারা বারবার স্বীকার করছে, তাদের নিজেদের মৃত্যুদণ্ডের বিচারধারা এলোমেলো, একদমই সংগতিপূর্ণ নয়; আইনের চোখে সবার সমান অধিকার, এটা ধারাবাহিকভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে। বচন সিং-এর ক্ষেত্রে (১৯৮২) প্রাক্তন মুখ্য বিচারপতি ভগবতী বলেছিলেন, সুপ্রিম কোর্ট ণ্ণএলোমেলোভাবে এবং পাগলের মতো’ মৃত্যুদণ্ড দিচ্ছে। তিনি কি ভুল বলেছিলেন?
… হরবংশ সিং-এর মামলা (১৯৮২) … তিনজনের সাজা হয়েছিল তিনটি আলাদা খুনের দায়ে, তিনজনেরই খুনে একই ভূমিকা ছিল। সুপ্রিম কোর্টের তিনটি বেঞ্চ নাটকীয়ভাবে তিনটি আলাদা রায় দিয়েছিল। কাশ্মীরির মৃত্যুদণ্ড যাবজ্জীবনে বদলে দেওয়া হয়েছিল, জিতার আবেদন নাকচ হয়েছিল এবং তার ফাঁসি হয়েছিল। হরবংশকে পাঠানো হয়েছিল রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমাভিক্ষার জন্য, যদিও আদালত প্রথমে তার আবেদন নাকচ করে এবং রায়ের পুনর্বিবেচনার আবেদনও নাকচ করে।
মৃত্যুদণ্ডের রায়গুলোতে ণ্ণভুলবোঝাবুঝি, স্ববিরোধ এবং বিভ্রান্তির একটি চিত্র’-র উদাহরণ ভুরিভুরি। একই ধরনের মামলার রায় হয়েছে এত আলাদা, যে রীতিমতো চিন্তায় পড়ে যেতে হয়। এই মামলাগুলোতে যেগুলির ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে এবং যেগুলির ক্ষেত্রে যাবজ্জীবনে বদলে দেওয়া হয়েছে, সেগুলির মধ্যে বেঞ্চ-এর সদস্যদের তফাত ছাড়া পার্থক্য খুবই কম। বিচারপতি বালাকৃষ্ণন এবং সিনহা যেখানে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মামলায় যাবতীয় মৃত্যুদণ্ডকে যাবজ্জীবনে বদলে দিয়েছেন, সেখানে পাসায়াত এই ধরনের প্রতিটি মামলায় মৃত্যুদণ্ড ঊর্ধে তুলে ধরেছেন, এমনকী সেই সব ক্ষেত্রেও যেখানে নিম্নতর আদালত হয়তো অভিযুক্তকে মুক্তি দিয়েছে বা যাবজ্জীবন দিয়েছে। মৃত্যুদণ্ড আরও সমর্থনের অযোগ্য হয়ে যায় যখন দেখা যায়, সুপ্রিম কোর্টের চৌদ্দটির মধ্যে দু-তিনটি বেঞ্চেই কেবল মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে। এটা একটা লটারির মতো, একজন বিশেষ বিচারকের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি অভিযুক্তের বেঁচে থাকার পরিসংখ্যানগত সম্ভাবনা বাড়িয়ে বা কমিয়ে দেয়, সে যে প্রমাণই থাকুক না কেন। তিনজন বিচারকের তুলনা পরিষ্কার করে দেয়, বিচারকদের ব্যক্তিগত মর্জির ওপর মৃত্যুদণ্ড নির্ভর করে।
বিচারপতি পাসায়াতের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার হার ৭৩ শতাংশ, তা তাঁর সময়ের অন্যান্য বিচারপতিদের মোট মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার হারের (১৯ শতাংশ) তুলনায় অনেক বেশি। ফলে, একটি মামলা যদি পাসায়াতের বেঞ্চে গিয়ে না পড়ে, তাহলে তার মৃত্যুদণ্ড না পাওয়ার সম্ভাবনা চারগুণ বেশি। বিচারপতি সিনহার বেঞ্চ ও বিচারপতি পাসায়াতের বেঞ্চে একটি মৃত্যুদণ্ডের যোগ্য মামলা পড়ার সম্ভাবনা পঞ্চাশ-পঞ্চাশ। কিন্তু দোষীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা প্রায় একশো শতাংশ যদি সেটি দ্বিতীয়জনের কাছে না গিয়ে প্রথমজনের কাছে যায়। যদি মামলাটি পাসায়াতের কাছে না গিয়ে বালাকৃষ্ণনের বেঞ্চের কাছে যায়, তাহলে দোষীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা পঞ্চাশ শতাংশ বেড়ে যায়। একজন মৃত্যুদণ্ডাজ্ঞা প্রাপ্ত ব্যক্তি জিজ্ঞেস করতেই পারে, ণ্ণআমি বাঁচব কি মরব তা নির্ভর করবে প্রমাণের ওপর নয়, কার বেঞ্চে গিয়ে আমার মামলাটি পড়ল, তার ওপর? এটি কি আইনানুগ ব্যাপার?’ ব্ল্যাকশিল্ডের গবেষণা (১৯৭২-১৯৭৬) বিচারকদের মধ্যে একইরকম বা এর চেয়েও খারাপ তফাত দেখিয়েছিল। বিচারপতি ভাগবতী ঠিকই বলেছিলেন, ণ্ণএকজন মানুষ বাঁচবে কি মরবে তা বেঞ্চ-এর বিন্যাসের ওপর নির্ভর করছে, তাই মৃত্যুদণ্ড এলোমেলো এবং অনির্ভরযোগ্য একটি শাস্তি’। এটি যে সত্য তা আরও বোঝা যায়, যখন বিচারপতি কৃষ্ণ আয়ারের জীবনের পবিত্রতা, সবচেয়ে খারাপ অপরাধীরও শুধরে যাওয়ার সম্ভাবনা এবং মৃত্যুদণ্ডের বর্বর দিকটি নিয়ে মন্তব্য, এবং বচন সিং রায়-এর পরে কিছু বিচারপতির আক্ষেপ যে তা ‘দুর্ভাগ্যবশত’ তাদের আরও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া থেকে বিরত করেছে, দুটিকে পাশাপাশি রাখা যায়।
ভারতে মৃত্যুদণ্ডের শাস্তির আইন চালু করেন বচন সিং। এবং পরবর্তী বিচারগুলি বচন সিং-এর বিচারের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে করা হয়েছে। বচন সিং চালু করেছিলেন, বিচারপতিদের দুদিনই দেখতে হবে, যে ঘটনা পরম্পরায় অপরাধ সংগঠিত হয়েছে এবং যে ঘটনা পরম্পরায় অপরাধী তৈরি হয়েছে। যদিও, সন্ত্রাসবাদ এবং জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রে বিচারবিভাগীয় সতর্কতা পেছনের সারিতে চলে যায়, এবং ওই অপরাধের প্রতি ঘৃণাটিই মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। রাভজি নামের একটি লোক তার পরিবারকে হত্যা করেছিল, কারণ সে সন্দেহ করেছিল, তার স্ত্রী তার প্রতি বিশ্বাসভাজন থাকেনি এবং সন্তানেরা আসলে জারজ। এখন, এই মামলায় কেবল যদি অপরাধের ঘটনা পরম্পরাকে দেখা হয়, তাহলে ফাঁসির সাজাই হবে। কিন্তু যদি ব্যক্তি, অর্থাৎ অপরাধীর ঘটনা পরম্পরাকে বিবেচনায় আনা হয়, তারা দেখবে একজন মানুষকে যার মাথার গোলমাল আছে। এবং হয়তো তাকে ক্ষমা করে দেবে ও তার ফাঁসি মকুব হবে। কিন্তু অপরাধটি এতই নৃশংস এবং শিহরণ জাগানো, তারা কিন্তু ওসব করবে না। তাই আইনে বলা হল, মারাত্মক অপরাধের ক্ষেত্রে অপরাধীর ঘটনা পরম্পরা দেখা হবে না, কেবল অপরাধের ঘটনা পরম্পরা দেখা হবে। এবং রাভজির ফাঁসির সাজা হল।
বচন সিং-এর নীতির হাত ধরে আইনের যে নতুন ধারা জন্ম নিয়েছিল, তা আবার কয়েক মাসের মধ্যেই উল্লিখিত হল, সুরজা রামকে ফাঁসিকাঠে ঝোলানোর জন্য। পরের দশ বছরে তা বার বার উল্লেখ করা হয়েছে আরও বারোজনকে ফাঁসির সাজা দেওয়ার জন্য। এই ভুল নীতির হাত ধরে মোট পনেরোজনের ফাঁসির সাজা হয়েছে। ২০০৯ সালে সুপ্রিম কোর্ট এই ভুলটি ধরে এবং ঘোষণা করে, রাভজির মামলা ও পরবর্তী সাতটি মামলায় ভুল রায়দান হয়েছে, বা আইন না জেনে করা হয়েছে। তারপর, আরও দুটি বেঞ্চ এই একই কথা বলে। যদিও ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে, তার মধ্যেই রাভজি এবং অন্যান্য কিছু ফাঁসির সাজাপ্রাপ্তদের ফাঁসি হয়ে গেছে। একজন সাজাপ্রাপ্ত অপ্রাপ্তবয়স্ক বলে ঘোষিত হয়েছে, এবং চারজনের ফাঁসি মকুব করেছে সরকার। সাতজন তখনও ফাঁসির অপেক্ষায় দিন গুনছে, যদিও অন্তত চারটি আলাদা আলাদা মামলায় সুপ্রিম কোর্ট স্বীকার করেছে যে, তাদের মৃত্যুদণ্ডের রায় না জেনে দেওয়া হয়েছে।
একটা আন্দোলন শুরু করা হয়, যাতে হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের চৌদ্দজন বিচারপতি রাষ্ট্রপতিকে আবেদন করে এই মৃত্যুদণ্ডগুলি মকুব করার জন্য। এই মামলাগুলির মধ্যে ছিল সাইবান্নার মামলা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পরামর্শমতো রাষ্ট্রপতি সম্প্রতি সাইবান্নার ক্ষমার আবেদন নাকচ করে দিয়েছেন। সাইবান্না যে কোনোদিন ফাঁসিকাঠে ঝুলে যেতে পারেন। তাঁর মতো হাল আরও ছয়জন বন্দির।
সাইবান্নার মামলাটি নিয়ে এবার একটু বলি।
ভারতীয় পেনাল কোডের ৩০৩ পরিচ্ছদের একটি ধারায় বলা ছিল, একজন যাবজ্জীবনপ্রাপ্ত সাজা চলাকালীন দ্বিতীয় খুন করলে অবশ্যই তাকে তখন ফাঁসির সাজা দিতে হবে। এটা আবশ্যিক। ১৯৮৩ সালে এই ধারাটি অসাংবিধানিক বলে বাতিল হয়ে যায়। ধারাটি বাতিল হওয়ার ও বিধানের বই থেকে উঠে যাওয়ার বিশ বছর পরে সাইবান্নার ওপর ৩০৩ ধারায় চার্জ দেওয়া হয়। অস্তিত্বহীন একটি ধারায় তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং তাঁর বাধ্যতামূলক ফাঁসির সাজা হয়! তার উকিল বিচারককে বলেছিল, যে ধারায় তাকে ফাঁসি দেওয়া হচ্ছে, তার আদতে অস্তিত্বই নেই। এখানে আমাদের বুঝতে হবে বাধ্যতামূলক মৃত্যুদণ্ড (mandatory death sentence) এবং বিচারের ফলে মৃত্যুদণ্ডের (discretionary death sentence) তফাত। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে অভিযুক্তর অধিকার আছে আদালতে নিজের কথা বলার এবং কোন পরিস্থিতিতে সে কাজটি করেছে তা বলার। আদালত রায় দেওয়ার সময় এইগুলি বিবেচনায় আনে। কারণ, সুপ্রিম কোর্টেই বলা হয়েছিল, অপরাধ এবং অপরাধী — দুইয়েরই পরিস্থিতি বিচার করতে হবে রায়দানের সময়। তাই রায়দানের ঠিক পূর্বে এই শুনানিটি অভিযুক্তের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
সাইবান্নার মামলায় যেহেতু বিচারক ৩০৩ নম্বর ধারা ধরে এগিয়েছিলেন, যেখানে বাধ্যতামূলক মৃত্যুদণ্ড রয়েছে, তাই সেক্ষেত্রে অভিযুক্তের রায়দানের সময় নিজের কথা বলার সুযোগ ছিল না, কোন পরিস্থিতিতে এই কাজ সে করেছে তা বলার সুযোগও ছিল না। তাই সাইবান্নার সাজা হল। বিষয়টি যখন হাইকোর্টে গিয়ে পৌঁছোল, ভুলটি আরও বেড়ে গেল, কারণ ৩০৩ নং ধারায় শাস্তিটিকেই বজায় রাখা হল, ওই ধারাটি বিধান বই থেকে তুলে দেওয়ার ২৩ বছর পর। এবার মামলাটি সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে পৌঁছোল। সুপ্রিম কোর্ট ট্রায়াল কোর্টের ৩০২ ধারায় সাইবান্নার শাস্তি বহাল রাখল; কারণ হাই কোর্ট ৩০২ নং ধারায় শাস্তিটি দিয়েছিল। আরও বড়ো কথা, যেহেতু অপরাধী কোন পরিস্থিতিতে অপরাধটি করেছে তার কোনো নথি নেই, তাই ৩০২ ধারায় সুপ্রিম কোর্ট তার মৃত্যুদণ্ড দিল। এই মামলায় ৩০২ ধারার কথা কোথাও ছিল না। তাই কীভাবে ওই পরিস্থিতির নথি থাকবে, যখন ওই রায়দানের সময় কোনো শুনানিই হয়নি। যদিও সুপ্রিম কোর্ট পরে জানায়, বিচারে ভুল ছিল এবং চোদ্দজন বিচারক রাষ্ট্রপতির কাছে চিঠি লেখেন, সাইবান্নার ক্ষমাভিক্ষার আবেদন রাষ্ট্রপতি নাকচ করে দেন।
এবার রাজীব গান্ধীর হত্যা মামলাটিতে আসা যাক। রাজীব গান্ধী হত্যার ঘটনায় ট্রায়াল কোর্টে ২৬ জনের বিচার হয়েছিল। সব্বাই দোষী সাব্যস্ত হয়েছিল। সব্বাইকে ফাঁসির সাজা দেওয়া হয়েছিল। তাদের টাডা-তে বিচার হয়েছিল, এবং দ্রুত গতির বিচার (fast track justice), তাই হাইকোর্টে কোনো আবেদন করা হয়নি। তাই বিষয়টি সোজা সুপ্রিম কোর্টে গেল। সেখানে ২৬ জনের মধ্যে ১৯ জন মৃত্যুদণ্ডাজ্ঞা প্রাপ্ত আসামী বেকসুর খালাস পেল। ভেবে দেখুন, কত ফারাক এই মৃত্যুদণ্ড এবং তারপর বেকসুর খালাস-এর। সেই বিচারব্যবস্থায় কিছু মারাত্মক ভুল আছে, যা ২৬ জনকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পরে প্রথম আপিলেই তাদের মধ্যে ১৯ জনকে বেকসুর খালাস করে দেয়। বাকি সাতজনের মধ্যে চারজনকে সুপ্রিম কোর্ট ফাঁসির সাজা দেয়। তাদের মধ্যে একজন ছিল বালক, সুপ্রিম কোর্টের মতে যার একমাত্র অপরাধ ছিল যারা ধানু-র গায়ে বোমাটি বেঁধেছিল, তাদের একটি ১৪ ভোল্টের ব্যাটারি কিনে দেওয়া।
আমি আগেই বলেছি, সাধারণ আইনে স্বীকারোক্তিকে প্রমাণ হিসেবে ধরা হয় না, কিন্তু বিশেষ আইন যেমন টাডা-তে স্বীকারোক্তিকে অপরাধীর বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা হয়। রাজীব গান্ধী হত্যা মামলায় ওই সাতজনের বিরুদ্ধে স্বীকারোক্তিকে গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট স্বীকার করে নিয়েছিল, এক্ষেত্রে টাডা প্রয়োগ করা যাবে না। তাই অভিযুক্তরা টাডা থেকে ছাড় পেয়ে যায়। এখন, যদি টাডা প্রয়োগ করা না যায়, সেক্ষেত্রে স্বীকারোক্তিগুলিও প্রমাণ হিসেবে আর থাকে না। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট বলে, ণ্ণনা’। সুপ্রিম কোর্টের এই কথা বলার কারণ, ওদের টাডাতে ধরা হয়েছিল, এবং টাডার ফলেই স্বীকারোক্তিকে প্রমাণ হিসেবে রেখে ওদের দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল, তাই এখন ওগুলোকে বাতিল করা যাবে না। এখন কালকে যদি তুমি একজন চোরকে, যাকে অন্য কোনোভাবে দোষী সাব্যস্ত করা যাবে না, তাকে টাডা দাও এবং চুরির দায় দাও। তারপর সে হয়তো সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ থেকে মুক্ত হয়ে যাবে, কিন্তু তার স্বীকারোক্তি যেহেতু প্রমাণ হিসেবে নথিভুক্ত হতে পেরেছে টাডার কারণে, তাই তার বলে তাকে চোর হিসেবে দোষী সাব্যস্ত করা যাবে। এরকমই ছিল বিচারপতিদের যুক্তি।
একে তো এলোমেলো, তার ওপর মৃত্যুদণ্ড পক্ষপাতদুষ্টও বটে। বিচারপতি কৃষ্ণা দেখেছিলেন, মৃত্যুদণ্ডের শ্রেণী ও গাত্রবর্ণের পক্ষপাত আছে। চৌদ্দজন মৃত্যুদণ্ডাজ্ঞাপ্রাপ্ত বন্দীর মধ্যে বারোজনই আইনি সহায়তা পেয়েছিল সরকারিভাবে। সাধারণত, মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে নথির পরিমাণ হয় বিশাল এবং বিচার চলে ৬-৯ মাস ধরে। বেশিরভাগ জায়গাতেই, এই সহায়তা উকিলরা একটা মৃত্যুদণ্ডের বিচারে পায় ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা, হাইকোর্টেও পায় ওইরকমই, আর সুপ্রিম কোর্টে আপিল হলে পায় ৪০০০ টাকা। এই পরিমাণটি এক দশকের ওপর ধরে একই রয়েছে। এতে যাতায়াত ও অন্যান্য খরচ পোষায় না। আইনি সহায়তার নিয়মে রয়েছে, মৃত্যুদণ্ড হতে পারে এমন সমস্ত মামলায় বরিষ্ঠ উকিল দিতে হবে, কিন্তু তা কদাচিৎ হয়। কাঁচা, অনভিজ্ঞ জুনিয়রদের এইসব মামলাগুলিতে দেওয়া হয়, সিনিয়ররা নিতে চায় না এগুলো। তাই অবাক হওয়ার কিছু নেই, উচ্চতর আদালত মামলাগুলি ফের ট্রায়াল কোর্টেই ফেরত পাঠায়, কারণ বন্দীরা ঠিকমতো আইনি সহায়তাই পায়নি বিচারের সময়। কিন্তু এরকম আরও অনেক মামলাই গলে চলে আসে। তাই অবাক হওয়ার কিছু নেই, ন্যায়বিচার না হওয়া, ভুল বশত দোষী করা, এবং মৃত্যুদণ্ড হওয়া মামলাগুলির বেশিরভাগই কোনো না কোনো সময় আইনি সহায়তার উকিল দিয়ে সওয়াল করেছে। এই আইনি সহায়তা উকিলদের অত্যন্ত কম পয়সা দেওয়ার ব্যবস্থাটি প্রথমেই সম্ভাব্য মৃত্যুদণ্ডের আসামীদের মধ্যে দরিদ্রদের বেহাল দশায় নিক্ষেপ করে।
সংবিধান নাগরিকদের কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছে, আইনের কাছে সবাই সমান এবং এলোমেলো বিচার থেকে সুরক্ষা পাবে সবাই। যার মানে দাঁড়ায়, এদের অর্থনৈতিক ক্ষমতা না-ই থাকতে পারে, কিন্তু এদের মামলাগুলিও অন্যান্যদের মামলাগুলির মতোই সমান বিচার পাবে। আদালতকে এই প্রতিজ্ঞা উচ্চে তুলে ধরতে হবে, কারণ এটাই বিচারব্যবস্থার ন্যায্যতার ভিত্তিভূমি। যেহেতু মৃত্যুদণ্ড সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে এবং সব দিক বজায় রেখে দেওয়া যায় না, তাই এটা তুলে দেওয়া দরকার। কারণ এই পূর্বশর্তগুলি ছাড়া, প্রতিশোধমূলক হত্যার থেকে বিচারব্যবস্থার হাতে হত্যার খুব একটা তফাত থাকে না।
এবার আমরা তৃতীয় অংশে আসি। যেভাবে মানুষকে ফাঁসি দেওয়া হয়। ঐতিহাসিকভাবে ক্ষমা করার ক্ষমতা ন্যস্ত রয়েছে সার্বভৌমের হাতে। তাই থাকুক। এতে বিচারব্যবস্থার যদি কোনো গলদ থাকে তবে তা শুধরে নেওয়া যায়। এতে ন্যায়বিচার এবং ক্ষমা প্রদর্শন একসাথে গাঁথা যায়। ন্যায়বিচার কথাটা এর সম্প্রসারিত অর্থে ব্যবহৃত, যাতে কেবল আইন যেগুলোর নাগাল পায় না, সেগুলিকেও বিচারের আওতায় আনা যায়। তাই এই ক্ষমতা রেখে দেওয়া প্রয়োজন : বিচারব্যবস্থার ভুল সংশোধনের জন্য, ন্যায় বিচার এবং সহানুভূতিকে মেলানোর জন্য, এবং সর্বাধিক ন্যায়বিচার দেওয়ার জন্য। এইজন্যই সমস্ত দেশেরই ক্ষমা করার ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু এখন আপনি যদি এই ক্ষমার ক্ষমতার দিকে তাকান তাহলে দেখবেন, এটাকে সরকার অন্যান্য দাবি থেকে নজর ঘুরিয়ে দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। আপনি কাসভের ফাঁসির সময়টা দেখুন। আফজলের ফাঁসির সময়টা দেখুন। ২০০১ সালে পার্লামেন্ট আক্রমণ হয়। ২০০৫ সালে সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয়। ২০১৩ সালে আফজল গুরুকে ফাঁসি দেওয়া হয়। আট বছর পরে। হঠাৎ করে আজকে (৯ ফেব্রুয়ারি)। সে পার্লামেন্ট আক্রমণে তার ভূমিকার জন্য ফাঁসিতে চড়েনি, আমি আপনাকে লিখে দিতে পারি। আট বছর ধরে ওরা ক্ষমাভিক্ষার আবেদনটিকে ফেলে রেখে দিয়েছিল। হঠাৎ, যখন বিজেপি কংগ্রেস সরকারকে কোণঠাসা করে দিয়েছে বিভিন্ন ইস্যুতে, যেমন জাতীয় নিরাপত্তা, অপরাধ প্রভৃতি, তখন তাকে মারা হল। কাসভের মৃত্যুর পরেও একটি পার্লামেন্ট সেশন শুরু হবার কথা ছিল, এখন আবার একটি পার্লামেন্ট সেশন শুরু হবার কথা।
অবশ্যই এই ফাঁসি দেওয়ার ধরনটিকে প্রশ্ন করা উচিত। সংবিধানের ২১ নং ধারা কেবল ভারতীয় নাগরিকের ক্ষেত্রে নয়, সমস্ত মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ২১ নং ধারায় বলা আছে, কোনো মানুষের জীবন বা ব্যক্তিগত স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া যাবে না, যদি না আইনের পদ্ধতি মেনে তা করা হয়। এবং সুপ্রিম কোর্টের মতে সেই পদ্ধতি হতে হবে ন্যায্য, যথাযথ, এবং যৌক্তিক। যদি আপনি কারোর জীবন নিতে চান, আপনাকে আইনের পদ্ধতিগুলি মেনেই তা করতে হবে। আইনে কী পদ্ধতির কথা বলা আছে? সরকারি নিয়মে আছে, যখন একজনের ক্ষমাভিক্ষার আবেদন করা হয়, এবং সেটা মানা না হয়, তখন সেই ক্ষমাভিক্ষা যে-ই করে থাকুক, তাকে জানাতে হবে, যে আবেদনটি নাকচ হয়েছে। বন্দী এবং তার পরিবারকে জানাতে হবে, সেটা নাকচ হয়েছে। এবং আগে থেকে বলে দিতে হবে, কবে ফাঁসি হবে।
কাসভের ক্ষেত্রে, রাষ্ট্রপতি যেদিন ক্ষমাভিক্ষার আবেদনটি নাকচ করলেন, তার পরদিন একজন সাংবাদিক একটি আরটিআই আবেদন করে জানতে চান, এবং তাকে জানানো হয়, কাসভের ক্ষমাভিক্ষার আবেদনটি এখনও ঝুলে রয়েছে। এই মিথ্যে কথাটা বলার দরকার কী ছিল? সরকার কখনও মিথ্যে কথা বলতে পারে না। সরকার নিজেই যে পদ্ধতি তৈরি করেছে, তাকে না মানার কারণ কী? সরকার তো বিচারবিভাগের কাছ থেকে কাসভকে ফাঁসি দেবার কর্তৃত্ব পেয়েই গিয়েছিল। তাহলে এইভাবে রাতের অন্ধকারে, তার পরিবারকে না জানিয়ে ফাঁসি দেওয়ার কারণ কী? ওদের কাছে তো কাসভের পরিবারের ঠিকানা ছিল। অনেকে কাসভকে ক্ষমা করে দেওয়ার আবেদন করেছিল। তাদের কাউকেই জানানো হয়নি যে ক্ষমাভিক্ষার আবেদনটি নাকচ হয়েছে। অথচ নিয়মে সেরকমই বলা আছে। কেন এমন কথা বলা আছে নিয়মে? কারণ একজন মানুষ তার শেষ নিঃশ্বাস নেওয়া পর্যন্ত বিচারব্যবস্থার দ্বারস্থ হওয়ার অধিকারী। এবং যদি দেখা যায় তার ক্ষমাভিক্ষার আবেদন অনেক দিন ধরে পড়ে রয়েছে, তাহলে সুপ্রিম কোর্ট বলছে যে ওই ব্যক্তির সম্পূর্ণ অধিকার আছে সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে তার ফাঁসির সাজা মকুব করে দেওয়ার আবেদন করার।
অনেক অধিকার আছে, যেগুলো আদায় করতে গেলে আদালতে যেতে হয়। তাই ক্ষমাভিক্ষার আবেদন এবং ফাঁসির দিনের মধ্যে একটা ছোট্ট ফাঁক থাকে যখন দোষী ফের বিচারব্যবস্থার কাছে আবেদন করতে পারে। কিন্তু না কাসভ, না আফজল, কেউই এই সুযোগ পায়নি। কাসভের ফাঁসির পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, আমরা এটা নীরবে ও গোপনে করেছি, কারণ আমরা চাইছিলাম না যে লোকে আদালতে চলে যাক। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একই কথা বলেছিলেন আফজলের মৃত্যুর পরে। এটা গণতন্ত্রের পক্ষে একটা পিলে চমকানো বিবৃতি : দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই দেশের আইন ভাঙছেন। আমরা নিশ্চয়ই পুলিশ রাষ্ট্র হয়ে উঠছি না? আফজল গুরুর বউ আছে, পরিবার আছে। দিল্লি থেকে খুব একটা দূরেও তারা থাকে না। বন্দীর সঙ্গে দেখা করার যে অনুমতি বিধানে আছে, তাও দেওয়া হয়নি। এভাবেই আমরা লোককে ফাঁসি দিই। ওরা এই কাজ আগে কাসভের সঙ্গে করেছে, এখন করল আফজলের সঙ্গে।
সম্প্রতি আমাদের বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, যিনি আগে পুলিশে সাব-ইন্সপেক্টরের চাকরি করতেন, তিনি কতটা মেয়েদের অধিকার নিয়ে ভাবিত এবং অপরাধ বিষয়ে কত কড়া, তা দেখানোর জন্য গর্বভরে ঘোষণা করেছেন, তিনি কোনো ধর্ষকের ফাঁসির সাজা মকুব করবেন না কখনও। এর ফলে ভাবা হচ্ছে যে রাস্তাঘাট মেয়েদের জন্য নিরাপদ হবে, যেমন কাসভের ফাঁসির মধ্যে দিয়ে ভারত নিজেকে সন্ত্রাসবাদী হামলা থেকে নিরাপদ রাখতে পারবে, এবং সাইবান্না ও দাস-কে ফাঁসি দিয়ে কাউকে একাধিকবার খুন করা থেকে বিরত করতে পারবে। তারা অপরাধ বিষয়ে কতটা কড়া তা বোঝানোর জন্য ফাঁসি এবং মৃত্যুদণ্ডের সাজা রাজনৈতিক নেতাদের হাতের তাস। এর বদলে আরও কঠিন, প্রস্তুতি নিয়ে করা এবং জটিল কাজ, যা করা দরকার ভবিষ্যতের আক্রমণ এড়ানোর জন্য এবং অপরাধের কারণটিকে বিলোপ করার জন্য, তা না করে মৃত্যুদণ্ডের মতো সোজাসাপটা পন্থায় প্রাণের বিনিময়ে সস্তায় মানুষের ক্ষোভকে থামানো যায়।
বাস্তবে মৃত্যুদণ্ড আসলে একটি নজর ঘুরিয়ে দেওয়ার উপায়, যা সরকারের অকর্মণ্যতাকে আড়াল করে। এটা লোকের রক্তপিপাসাকে পুঁজি করে, ফাঁসি দিলেই যবনিকাপাত হবে — এই বিশ্বাসকে জোরালো করে। কিন্তু আমরা জানি, ফাঁসি দিলেই সমস্যাটা মিটে যাবে না, যবনিকা টানা যাবে না। বরং তা আড়াল হবে। রাষ্ট্রের সম্মতিতে খুন করে কিছুই হয় না, আমাদের মধ্যে যে রক্তের পিপাসা আছে, তা মেটে। এই রক্তপিপাসাকে তোল্লাই দিয়ে ফাঁসি বা লিঙ্গচ্ছেদের মতো নয়া কিসিমের রাষ্ট্রীয় হিংসা কেবল আরও হিংসাত্মক সমাজের দিকে আমাদের নিয়ে যাবে, হিংসা কমাবে না। যদি আমাদের সমাজকে আরও মানবিক বা সহানুভূতিসম্পন্ন হয়ে উঠতে হয়, এবং আরও ভালো, কম রক্তপিপাসু সমাজ আমাদের সন্তানদের জন্য রেখে যেতে হয়, আমাদের এই প্রতিহিংসাকে ছাঁটতে হবে।
বিচারবিভাগীয় ভুল, বানানো প্রমাণ এবং রায় কার্যকর যারা করবে সেই রাজনৈতিক নেতাদের কুটিলতা — এই তিনের যৌথ উদ্যোগেই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় ধোঁয়াশাময় আদালতকক্ষে, সাধারণ লোকের পক্ষে অবোধ্য আইনি বাগাড়ম্বরে, এবং কার্যকর হয় উঁচু দেওয়ালের জেলখানার ভেতরে গোপনে রাতের অন্ধকার কাটতে না কাটতেই। যদিও রাষ্ট্রের হত্যা করে শাস্তি দেওয়ার অধিকার নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়, কিন্তু যে প্রক্রিয়ায় বন্দীকে কাঠগড়া থেকে মুখ ঢাকা দিয়ে ফাঁসিকাঠে নিয়ে যাওয়া হয়, তা একইরকম রাখাঢাকা থাকে। যেহেতু মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় আমাদের নামে, তাই আমাদের সেগুলো সম্পর্কে আরও বেশি জানতে চাওয়া দরকার এবং জেনে নিয়ে নিজেদের মতামত ঠিক করা দরকার।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s