একটি রাজনৈতিক ফাঁসি

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক নির্মালাংশু মুখার্জীর প্রবন্ধ A Political Hangingএর অনুবাদ তাঁর অনুমতিক্রমে প্রকাশিত হল। বঙ্গানুবাদ করেছেন তমাল ভৌমিক।

এক

তিহার জেলে গোপনে আফজল গুরুর ফাঁসি ও কবর দেওয়ার পর থেকে যেভাবে এই প্রাণদণ্ডের ঘটনা হয়েছে তার জন্য সরকারকে অনেক লেখকই সঠিকভাবে দোষারোপ করছেন। যাই হোক না কেন, একবার যখন রাষ্ট্র একজনকে ফাঁসি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন সেই হত্যাকাণ্ড ণ্ণস্বচ্ছতার সঙ্গে ণ্ণমর্যাদাপূর্ণভাবে হল কিনা সেটা মূলত একটা নন্দনতাত্ত্বিক প্রসঙ্গ। কিন্তু হত্যাকাণ্ড শুরু হল যেপ্রক্রিয়া থেকে তা খুব জরুরি জ্ঞানতাত্ত্বিক আলোচনার বিষয়।

যে সময়ে ও যেভাবে এই ফাঁসিটা দেওয়া হল তা নিঃসন্দেহে সরকারের রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি প্রকট করে তোলে। গ্রেপ্তার হওয়ার শুরু থেকে ক্ষমাভিক্ষার আবেদন প্রত্যাখ্যান পর্যন্ত আফজল গুরুর কেসের সমস্ত ঘটনাকে যদি আমরা খেয়াল করি তাহলে এই রাজনৈতিক বিবেচনাপ্রসূত দুরভিসন্ধির ব্যাপারটা আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রপতি ক্ষমাভিক্ষার আবেদন প্রত্যাখ্যান করার মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে তাঁর ফাঁসি হয়ে যাওয়াটা ওই রাজনৈতিক প্রক্রিয়ারই অবশ্যম্ভাবী পরিসমাপ্তি।

মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণের দুটি অংশ আছে। প্রথম অংশটা হল : ভারতের সুপ্রিম কোর্টে প্রাণদণ্ড ঘোষণা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার প্রক্রিয়া শেষ হয়ে যাওয়া; পরের অংশ হল : ভারতীয় সংবিধানের ৭২()(সি) ধারা অনুসারে তা প্রেসিডেন্টের এক্তিয়ারে চলে যাওয়া। আমার মতে আফজল গুরুর চূড়ান্ত ঘোষণার পিছনে বিদ্বেষপূর্ণ রাজনৈতিক মনোভাব একটা বিরাট ভূমিকা নিয়েছিল। রাজনৈতিক প্রয়োজনে আফজল গুরুকে হত্যা করা দরকার ছিল, তাই এই প্রাণদণ্ড। কিছু লেখক, আমিও তার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত, খানিক আন্দাজে এই সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন। এখন আমার মনে হচ্ছে এই ভাবনাটা আরও খুঁটিয়ে দেখা যায়। সুপ্রিম কোর্টে আফজলের পক্ষের উকিল প্রবীণ আইনজীবী সুশীল কুমার যে দুটো সাক্ষাৎকার দিয়েছেন সেখান থেকেই শুরু করা যায়। আসামী পক্ষের উকিল হিসেবে তিনি এই কেসটাকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন এবং তাঁর মতে এই বিচারটা একদমই গ্রহণ করা যায় না। কেন, তা দেখাটাই গুরুত্বপূর্ণ।

আইনিবিচারের দিক থেকে দেখলে মূল কথাটা হল এই। এমনকী যেদিন আফজল গুরুর ফাঁসি হয় সেদিনও সুশীল কুমার এই কথাটাই ভেবেছেন যে বিশেষভাবে সন্ত্রাসীদের কেসে সিদ্ধান্ত টানা হয় স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে; কারণ সন্ত্রাসবাদীদের মূল পরিকল্পনা ও সংগঠন সব সময়েই রহস্য দিয়ে ঢাকা। তাই এই কেসগুলোকে পোক্ত করতে স্বীকারোক্তি সঠিক প্রমাণ করার জন্য পারিপার্শ্বিক বিষয়গুলোকে সাক্ষ্য হিসেবে দাঁড় করানো হয়। আবার পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যপ্রমাণও দাঁড়িয়ে থাকে স্বীকারোক্তির জোরে। তাতে করে বিচারব্যবস্থার সামনে হাজির করা তথ্যসাবুদে যে কারচুপি করা হয়নি তা বোঝানো যায়।

শ্রী কুমার দেখেছেন যে আফজল গুরুর কেসে তার স্বীকারোক্তিকে সুপ্রিম কোর্ট আমল দেয়নি। তাই বিচারবিভাগীয় সিদ্ধান্ত টানার পুরো ভরটাই নির্ভর করেছিল পারিপার্শ্বিক প্রমাণের গুণগত মানের ওপর, যেখানে (বড়ো রকমের) হেরফের ঘটানোর রাস্তা খোলাই ছিল। কুমারের কথা অনুযায়ী এই গুরুসমস্যার বিষয়টা আপীল চলার সময়ে ঠিকভাবে পরীক্ষা করে দেখা হয়নি এবং তার জন্য দায়ী সেশন কোর্টের অন্যায় বিচার। সুশীল কুমারের মতে, সাক্ষ্যপ্রমাণ যা হাতে ছিল, তার ভিত্তিতে আফজলের বেকসুর খালাস হওয়ার কথা।

শ্রী কুমারের মন্তব্যের এই জায়গাটা আমাদের খেয়াল করা উচিত তিনি কেমনভাবে যৌক্তিক সম্ভাবনা থেকে কঠিন পথ ধরে তথ্যের বাস্তব উপলব্ধির দিকে সরে যাচ্ছেন। আমি তাঁর কথার যা মানে ধরতে পেরেছি তাতে তিনি শুধু অসত্য সাক্ষ্যপ্রমাণ থেকে কী হতে পারত তার তাত্ত্বিক সম্ভাবনার প্রশ্ন তুলছেন না। তিনি আফজলের বেকসুর খালাস হওয়ার প্রস্তাব রাখছেন, যার মানে হল সাক্ষ্যপ্রমাণ যে বানানো হয়েছিল নথিভুক্ত তথ্যে তা প্রমাণিত হওয়ার ভয়ানক সম্ভাবনা আছে। এই বিষয়টাকে খুঁটিয়ে দেখবার জন্য এই কেসটার প্রধান অংশগুলো আমি বাধ্য হয়ে আবার পুনর্বিবেচনা করছি।

আফজলের স্বীকারোক্তি

শ্রী কুমারের বিতর্ক শুরু হয়েছে এই তথ্য দিয়ে যে আফজলের স্বীকারোক্তি সুপ্রিম কোর্ট খারিজ করেছিল। কোর্ট যেভাবে এই স্বীকারোক্তি প্রত্যাখ্যান করেছিল তা বেশ সন্দেহজনক। এই স্বীকারোক্তি আদায় হয়েছিল দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেলের এক্তিয়ারে ও পোটা (POTA) আইনের আওতায়। পুলিশের পক্ষ থেকে আফজলের স্বীকারোক্তিদান টেলিভিশনে দেখানো হয়েছিল ২০০১ সালের ২০ ডিসেম্বর, পার্লামেন্ট আক্রমণের ঘটনার এক সপ্তাহ পরেই যেখানে তদন্তকারী অফিসার হিসেবে পুলিশের অ্যাসিস্টান্ট কমিশনার রাজবীর সিং ছবির ফ্রেমের বাইরে থেকে টিভিচিত্র পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

সুপ্রিম কোর্টে বিরোধীপক্ষ বা আসামীপক্ষের উকিল যাঁরা ছিলেন তাঁরা সব তারকাআইনজীবী রাম জেঠমালানি (গিলানির পক্ষে), শান্তিভূষণ (শওকত এবং আফসানের পক্ষে) আর সুশীল কুমার (আফজল গুরুর পক্ষে)। তাঁরা দাবি করেছিলেন, স্বীকারোক্তি জোর করে, অত্যাচার করে আদায় করা হয়েছে। সত্যিই, এরকম তথ্য নথিভুক্ত করা আছে যে আসামীরা অভিযোগ করেছিল, পুলিশ তাদের সাদা কাগজে সই করতে বাধ্য করেছে এবং তারপর পুলিশ নিজে সেই সাদা কাগজে ইচ্ছেমতো লিখে নিয়েছে। উকিলদের যুক্তি শুনে কোর্টের পর্যবেক্ষণ হল ওগুলো সুচিন্তিত এবং মেনে নেওয়ার যোগ্য(plausible and persuasive)। তথাপি এটা খুবই আশ্চর্যজনক যে কোর্ট সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, এসব সম্ভাবনার কথায় না ঢুকতে। এতদসত্ত্বেও, কোর্ট স্বীকারোক্তিগুলো গ্রহণ করেনি, কারণ পোটার মতো নির্মম আইনেও যে সামান্য সুরক্ষা আছে, যেমন অভিযুক্তকে একজন আইনজীবী দেওয়া ইত্যাদি, সেগুলোও পুলিশ দেয়নি। এতে দেখা যাচ্ছে, যদিও সুপ্রিম কোর্ট দিল্লি পুলিশের বেআইনি কাজকর্মকে অল্প হলেও চিহ্নিত করল, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য আদায়ের জন্য বলপ্রয়োগের দোষে পুলিশকে সরাসরি তেমন অভিযুক্ত করল না।

ক্রিমিনাল কোডের ১৬৪নং সাধারণ ধারা (সুপ্রিম কোর্ট জাজমেন্ট, এসসিজে, পৃ: ১৪৮) অনুযায়ী কেন একজন ম্যাজিস্ট্রেটের এজলাসে স্বীকারোক্তি আদায় করা হল না, এই প্রশ্নের উত্তরে পুলিশ যে যথেষ্ট কারণ দেখাতে পারেনি সেটা কোর্ট মেনে নিল। শুনানি চলাকালীন কোর্টের মন্তব্য : পোটার আওতায় স্বীকারোক্তি তখনই নেওয়া যেতে পারে, যখন কিছু বিশেষ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, যেমন খুব প্রত্যন্ত একটা জায়গায় ঘটনা ঘটেছে, যেখানে কোনো ম্যাজিস্ট্রেটকে সহজে পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ এই কেসটা কিন্তু চলছিল নয়াদিল্লিতে। প্রকৃতপক্ষে, যে কথা আমি অন্যত্র বলেছি, শুধুমাত্র আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দেওয়া বা সুরক্ষা বিঘ্নিত হওয়ার তথ্য থেকে সহজেই এই সিদ্ধান্ত টানা যায় যে স্বীকারোক্তি বা জবানবন্দি জোর করে আদায় করা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও সুপ্রিম কোর্ট নিজে থেকে খোঁজ নেয়নি ওই জবানবন্দি জবরদস্তিমূলক কিনা। এটা নিশ্চিত যে গ্রহণযোগ্য সাক্ষ্য হিসেবে ওই জবানবন্দি একবার প্রত্যাখ্যান হয়ে যাওয়ার পরে ওই খোঁজ নেওয়ার কোনো আইনি বাধ্যতা ছিল না। কিন্তু ওই জবরদস্তিমূলক জবানবন্দির বিরুদ্ধে কোনো জোরালো মন্তব্য না করার জন্য একটা অস্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে।

তত্ত্বগতভাবেই এটা বেশ স্বাভাবিক যে আসামী পক্ষের জোরালো যুক্তি থেকে এক ধরনের সংকট তৈরি হচ্ছে। একদিকে, আসামী পক্ষের দৃঢ় যুক্তিগুলো না কেটে স্বীকারোক্তির ওপর আর ভরসা করা কঠিন হয়ে পড়ছিল এবং এই যুক্তিগুলো কাটা এক দুঃসাধ্য কাজ। অন্যদিকে, যদি ওই যুক্তির জোরে স্বীকারোক্তিগুলোকে বাতিল করতে হয়, তাহলে এই কেসটায় আসামীদের দোষী সাব্যস্ত করার কাজটাই সাংঘাতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যেটা আমরা পরে দেখব। এই উভয়সংকট থেকে মুক্তি পাওয়ার একটা রাস্তা হয়ে দাঁড়াল, টেকনিকাল কারণ দেখিয়ে স্বীকারোক্তিগুলোকে প্রত্যাখ্যান করা।

শুধু টেকনিকাল কারণ দেখিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য হিসেবে ওই স্বীকারোক্তি এড়িয়ে যাওয়া নিয়ে বড়ো প্রশ্ন অবশ্যই তোলা যায়। ট্রায়াল কোর্ট এবং হাইকোর্ট উভয়েই জবরদস্তির ব্যাপারটা উড়িয়ে দিয়েছিল। স্বীকারোক্তির ওপর নির্ভর করেই হাইকোর্ট আফজল গুরুকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল বিচারের রায়ে লেখা হয়েছিল, জাতি বা দেশের শুধু আর্থিক ক্ষতি হয়নি, আশু যুদ্ধের আশঙ্কায় দেশ ত্রস্ত হয়েছে(হাইকোর্ট জাজমেন্ট, এইচসিজে, ৪৪৮ অনুচ্ছেদ)। নিম্নতর দুই আদালতের বর্ণনায় দেখা যায় যে স্বীকারোক্তিগুলোই একমাত্র উৎস (সোর্স) যার থেকে ষড়যন্ত্রের খুঁটিনাটি কাশ্মীর বা অন্য কোথায় বসে সন্ত্রাসবাদীরা হামলার পরিকল্পনা করেছিল সব জানা গেছে। এরকম গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্যকে শুধুমাত্র সামান্য কিছু নিয়মের কারণে আমল না দেওয়াটা অবশ্যই মনটাকে হতবুদ্ধি করে দেয়। সমস্যাটা ঠিক কী ছিল? যেমন লিখেছি, কোর্ট এই প্রশ্নের কোনো জবাব দেয়নি। তা সত্ত্বেও এরকম একটা সম্ভাব্য উত্তর হতে পারে :

কাউকে যখন কোনো ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়, তখন অভিযুক্তর জবানবন্দি পুলিশ লিখে নেয় তদন্ত শুরু করার জন্য। খুলে বলা এই স্বীকারোক্তি পুলিশকে সাক্ষ্যপ্রমাণ জোগাড় করার পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। শুধুমাত্র এই খুলে বলাটাই সাক্ষ্যপ্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। এর সঙ্গে শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে যুক্ত হতে হয় পারিপার্শ্বিক প্রমাণ। পার্লামেন্ট আক্রমণের ঘটনায় স্বীকারোক্তি নিয়ে সমস্যা হল এটাই যে তা ওই খুলে বলা জবানবন্দির সঙ্গে একেবারে অক্ষরে অক্ষরে মিলে যায়। জোর করে জবানবন্দি গ্রহণ করার অর্থ হল উদ্ঘাটিত সত্যগুলোও যে জোর করে বানানো তার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। সেটাই হয় সমস্যাজনক।

জবানবন্দি যে জোর করে আদায় করা হয়েছিল তার পক্ষে যুক্তি দেওয়ার সময়ে প্রবীণ আইনজীবী শান্তিভূষণ সুপ্রিম কোর্টে প্রশ্ন করেছিলেন, উদ্ঘাটনগুলো যদি সত্যিই হয় তাহলে পুলিশ কেন ওই একই বিষয়ে স্বীকারোক্তির জন্য জবরদস্তি করেছিল? সুশীল কুমারের বক্তব্য হল, যদি উদ্ঘাটনগুলোও জবরদস্তিমূলক হয় তাহলে সেই অনুযায়ী যেসব সাক্ষ্যপ্রমাণ জোগাড় হয়েছিল সেগুলোও যে বানানো তার সম্ভাবনা ভয়ানক বেড়ে যায়। জবানবন্দি থেকে উদ্ঘাটন মারফত পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যপ্রমাণের গোটা শৃঙ্খলটাই অবিশ্বাসের সূত্র দিয়ে বাঁধা। সাদা কথা হল, যদি উদ্ঘাটন বেআইনি হয়, তাহলে সেই উদ্ঘাটনের সূত্র ধরেই পুলিশ পারিপার্শ্বিক প্রমাণগুলো সংগ্রহ করেছে এরকম ভাবার কোনো ভিত্তি নেই। পুলিশ কী করে ওই প্রমাণগুলো পেল তার ঠিক উত্তর দিতে না পারলে ওগুলো বানানো বলেই ধরে নিতে হবে। কিন্তু ঘটনাক্রমে এটাই দাঁড়াল, স্বীকারোক্তির প্রত্যাখ্যানের পরে সুপ্রিম কোর্ট সেই লাইন ধরে এই চিন্তায় পৌঁছাল না যে পুলিশ যেসব পারিপার্শ্বিক প্রমাণ হাজির করেছে সেগুলো সন্দেহজনক।

পারিপার্শ্বিক প্রমাণ

পুলিশ যে পারিপার্শ্বিক প্রমাণ হাজির করেছে তার যা গুণগত মান তাতে আমাদের এ ছকটাই স্বাভাবিক মনে হয়। ধরা যাক, আফজলের বিরুদ্ধে এই অভিযোগটি যে মর্গে নিহত আক্রমণকারীদের তিনি শনাক্ত করেছিলেন। অবশ্যই আফজলের স্বাক্ষর সম্বলিত একটি শনাক্তকরণের রসিদ পুলিশ আদালতে পেশ করেছিল। বিচার শুরু হওয়ার আগেই, এরকম কতকগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ আদালত নিয়োজিত আফজলের উকিল শ্রীমতী সীমা গুলাতির সম্মতিতেই নথিভুক্ত করা হয়েছিল। ফলত এইসব প্রমাণগুলোকে আর কোনো পরীক্ষা না করেই সব কোর্টই এগুলোকে সত্য বলে ধরে নিয়েছিল। এর সঙ্গে সঙ্গে এটাও কিন্তু নথিভুক্ত করা হয়েছিল যে আফজলের দাবি তাঁকে পুলিশ শনাক্তকরণ রসিদে জোর করে স্বাক্ষর করিয়েছিল। তাঁর কোনো উপায়ান্তর ছিল না। কারণ তাঁর কাছে খবর এসেছিল যে তাঁর ভাইকে কাশ্মীরে বেআইনিভাবে গ্রেপ্তার করে রাখা হয়েছে। যাই হোক না কেন, মোট কথা, এই সাক্ষ্য, যদি ঠিক হয়, তাহলে যা দাঁড়ায় আফজল আক্রমণকারীদের কয়েকজনকে চিনত। এই বিষয়টায় পরে আসছি।

দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ইত্যাদি নানা অভিযোগে আফজলকে যদি দোষী করতে হয়, তাহলে অপরাধীদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের আরও অনেক সূত্র পারিপার্শ্বিক প্রমাণ হিসেবে জোগাড় করতে হয়। মোটামুটিভাবে, সাক্ষ্যপ্রমাণ যা পাওয়া গিয়েছিল সেগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করা যায় :

  1. অপরাধীদের থাকার জায়গা ঠিক করে দেওয়া, তাদের মিটিংয়ে অংশগ্রহণ ইত্যাদি নানাভাবে ষড়যন্ত্রে সরাসরি অংশগ্রহণের অভিযোগ।

  2. ব্যবহৃত গাড়ি, মোটর সাইকেল, রাসায়নিক ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি উদ্ধার এবং সেগুলো যারা কিনতে গিয়েছিল তার মধ্যে আফজলও ছিলেন এই অভিযোগ এবং তার প্রমাণ হিসেবে সাক্ষীদের আফজলকে শনাক্ত করা।

  3. অপরাধের কাজে ব্যবহৃত ল্যাপটপ, ভিডিও যন্ত্র ও মোবাইল ফোন আফজলের কাছ থেকে পুলিশ কর্তৃক উদ্ধার, উদ্ধার করা মোবাইলটাই ছিল আফজলের সঙ্গে আক্রমণকারীদের যোগসূত্র এই অভিযোগ।

উপরোক্ত এই প্রমাণগুলোর ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো লক্ষ্যণীয় :

ক।ওপরের ১ ও ২নং অভিযোগের সাক্ষ্যপ্রমাণের জন্য ওই ওই অকুস্থলে আফজলকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল যাতে তাঁকে সেখানকার যারা দেখেছিল সেইসব সাধারণ মানুষ শনাক্ত করতে পারে। কিন্তু তার আগেই টেলিভিশনে বহুবার আফজলের মুখ দেখিয়ে দেওয়া হয়েছিল। হাইকোর্ট এই ঘটনায় বিরূপ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছিল (এইচসিজে, ১৩৯নং অনুচ্ছেদ), অর্থাৎ এটা নথিভুক্ত করা হয়েছিল।

খ।আফজলেরকাছ থেকে পাওয়া মোবাইল সুদ্ধ পুলিশ যা যা উদ্ধার করেছিল তার কোনোটারই কোনো স্বতন্ত্র সাক্ষী ছিল না।

গ।জনসাধারণের সাক্ষ্য নেওয়ার জন্য গফ্‌ফর মার্কেট, কারোলবাগের নাইওয়ালান এবং তিলক মার্কেটের গালি তেলিয়ান ইত্যাদি দোকানদারদের হাজির করা হয়েছিল। ট্রায়াল কোর্টের বিচারকের লেখায় (১০৯ পাতায়) আছে, একজন দোকানদার বলেছিলেন, গফ্‌ফর মার্কেটে স্বচ্ছতার সঙ্গে কিছু কেনাবেচা হয় না, কোনো বিলটিল দেওয়া হয় না, কিছু কাঁচা রসিদ রাখা হয়, যেগুলো প্রত্যেক সন্ধ্যেবেলায় নষ্ট করে ফেলা হয়। হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ, যে দোকানি রাসায়নিক বিক্রি করেছে, তার কাছে কোনো প্রমাণ নেই যে সে অভিযুক্ত মহম্মদ আফজলকে কিছু বিক্রি করেছে, সে যে আফজলের থেকে টাকা নিয়েছে তার কোনো রসিদও সে দেখাতে পারেনি(৬২নং অনুচ্ছেদ)। বাজারের ঘরভাড়া দেওয়ার ব্যবসার ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। আর বেশিরভাগ সময়ে ওই জায়গাগুলোই অভিযুক্তদের লুকোনোর স্থান হিসেবে চিহ্নিত হয়।

সুপ্রিম কোর্ট লক্ষ্য করেছে যে একজন বাড়িওয়ালা আদালতে মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছিল এবং তা নিশ্চিতভাবে পুলিশের চাপ খেয়ে। এই লোকগুলো তাদের ব্যবসা চালায় পুলিশের নাকের ডগায় বসে এবং পুলিশের যোগসাজশেই, সে যে কায়দাতেই হোক। বিভিন্ন সময়ে এদেরকে বিভিন্ন সাক্ষী হিসেবে কাজে লাগানো পুলিশের কাছে কী আর কঠিন?

ঘ।বিচারের সময়ে ৮০ জন সাক্ষীকে উপস্থিত করা হয়েছিল। এদের মধ্যে মাত্র ২২ জন সাক্ষীকে আফজলের পক্ষের উকিল শ্রী নীরজ বনসল একটা হলেও প্রশ্ন করেছিলেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এইসব সাক্ষ্যপ্রমাণ ছিল খুব ভাসাভাসা এবং তা গল্প সাজানোর পক্ষে হতাশজনকভাবে অপ্রতুল। ফলে এরকম একটা জটিল কেসে আফজল বাধ্য হয়েছিলেন নিজে এইসব সাক্ষীদের কথায় সত্যতা যাচাই করতে, যাকে আইনি ভাষায় বলা হয় ক্রসএক্‌জামিনেশন করা। প্রখ্যাত প্রবীণ আইনজীবী ইন্দিরা জইসিং বলেছেন, এগুলো তাঁকে করতে হয়েছিল এমন এক অবস্থায় যখন তাঁর হাতে কোনো কাগজ নেই যে কাগজে সাক্ষ্যপ্রমাণ কী কী হাজির করা হয়েছে সে বিষয়ে কিছু লেখা আছে, যে কাগজ হাতে পেলে তিনি হয়তো গরমিলগুলো তুলে ধরতে পারতেন। তাছাড়া, একজন প্রাণদণ্ডে অভিযুক্ত ব্যক্তির নিজের জন্য ক্রসএক্‌জামিনেশন করা একজন আইনজ্ঞের করার বিকল্প হতে পারে না আইনি পদ্ধতির এর চেয়ে বড়ো ভাঁড়ামি কল্পনাও করা যায় না। এটা খেয়াল রাখা খুবই দরকার যে জইসিং এই মন্তব্য করেছেন সুপ্রিম কোর্টের রায় ঘোষণার অন্তত একবছর পর।

ঙ। আফজলের পক্ষের উকিল কোনো সাক্ষীকে হাজির করেননি, এমনকী তাঁর পরিবারের সদস্যদেরও নয়। ফলে যে সময়ে তিনি ষড়যন্ত্র করেছিলেন বা আক্রমণকারীদের সঙ্গে মিটিং করছিলেন বলে অভিযোগ আনা হয়েছিল সেইসময়ে তিনি কোথায় ছিলেন তার কোনো পালটা সাক্ষ্যপ্রমাণ আনাও হল না। তাঁর ৩১৩নং বয়ানে আফজল তিনটে প্রামাণ্য তথ্য দিয়েছিলেন : () তিনি দিল্লিতে একটা ছোট্ট ঘরভাড়া করেছিলেন কাশ্মীর থেকে তাঁর পরিবারকে এনে রাখার জন্য। () ২০০১ সালের ১২ ডিসেম্বর তিনি কাশ্মীর রওনা দিয়েছিলেন, উদ্দেশ্য পরব কাটিয়ে পরিবারকে দিল্লি নিয়ে আসা। () জম্মু ও কাশ্মীরের পুলিশ তাঁকে যখন গ্রেপ্তার করে, তখন শ্রীনগর বাসস্ট্যান্ডে তিনি একা দাঁড়িয়েছিলেন। আফজলের উকিল তাঁর সঙ্গে দেখাই করেননি। ফলে আফজলের বয়ানের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য কোনো স্বতন্ত্র সাক্ষ্যগ্রহণের চেষ্টাই নেওয়া হয়নি। এটুকু হল হিমশৈলের চূড়া। আমরা এই কেসটার খুঁটিনাটির দিকে যত বেশি নজর বাড়াব ততই দেখব আইনকে অবমাননা করার নির্লজ্জ গতি বেড়েই চলেছে।

দুই

স্পেশাল সেলের ওপর নির্ভরতা

এই সমস্ত বাস্তব সত্যগুলো সুপ্রিম কোর্টের চোখের সামনে ছিল। যেহেতু আফজলের পক্ষে কার্যত কোনো উকিল ছিল না, পুলিশের অবাধ স্বাধীনতা ছিল কোর্টের সামনে বিকৃত প্রমাণ হাজির করা। উল্লেখ্য, এইসব প্রমাণগুলোকে সত্য বলে সমর্থন করার জন্য স্বীকারোক্তি তখন আর হাজির ছিল না। প্রমাণের সত্যতা যাচাই করার সবটাই তখন নির্ভর করছিল দিল্লি পুলিশ নামক তদন্তকারী সংস্থা সম্পর্কে কোর্টের মনোভাবের ওপর। এই কেসে ওই সংস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে যদি নিরপেক্ষভাবে প্রশ্ন তোলা যেত, তাহলে কিন্তু উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কেস সাজানোর সম্ভাবনা স্পষ্ট দেখা যেত।

ইতিমধ্যেই, এই সংস্থাটি, এমনকী এই কেসটাতেও যে বহুরকম বেআইনি কাজকর্ম করেছিল, তা নথিভুক্ত হয়েছিল। যেমন, সাধারণ মানুষকে অকারণে গ্রেপ্তার করা, সাদা কাগজে জোর করে কাউকে দিয়ে স্বাক্ষর করানো (এইচসিজে, ২১ অনুচ্ছেদ), টেলিফোনের তথ্য বিকৃত করা (এইচসিজে, ৩৪০ অনুচ্ছেদ), নিরপেক্ষ সাক্ষীদের নথিভুক্ত করতে না পারা, ইত্যাদি। এইসব তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কোর্ট যদি বলতে সম্মত হত যে স্বীকারোক্তি জোর করে আদায় করা হয়েছিল, তাহলে পুলিশের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং সত্য উদ্ঘাটন সম্পূর্ণ ধসে যেত। বস্তুত, সুপ্রিম কোর্ট স্বীকারোক্তি জবরদস্তিমূলক বলেনি এবং ধসে যাওয়ার ভয়ানক ঘটনাটি বাস্তবায়িত হয়নি।

তর্কের খাতিরেই ধরা যাক ওই স্বীকারোক্তি জবরদস্তিমূলক ছিল আর তার ফলাফল যা দাঁড়িয়েছিল তা আমরা দেখেছি। যেরকমটা শ্রী শান্তিভূষণ হাইকোর্টে বলেছিলেন, তদন্তকারী অফিসাররা আবেদনকারীদের বিরুদ্ধে তথ্যাদি বিকৃত করে সাক্ষ্যপ্রমাণ হাজির করার জন্য আগে থেকেই তৈরি হয়েছিল। অতঃপর একমাত্র যে সাক্ষ্যের ওপর কোর্ট নির্ভর করতে পারে তা হল এই তদন্তকারী অফিসারদের সঙ্গে সম্পর্কহীন একদম নিরপেক্ষ কোনো সাক্ষ্যের ওপর। এই প্রেক্ষিতে, একটি ব্যতিক্রম ছাড়া শুধুমাত্র পারিপার্শ্বিক প্রমাণের ওপর নির্ভর করা খুবই বিস্ময়কর ব্যাপার হত।

সেই একটি ব্যতিক্রমের সাক্ষ্যপ্রমাণ ছিল যে আফজল মহাম্মদ নামে একজন আক্রমণকারীর সঙ্গে একটা মোটরগাড়ি কিনতে গিয়েছিল এবং সেই গাড়ি ওই আক্রমণে ব্যবহার করা হয়েছিল, আফজল ওই গাড়ি খরিদের রসিদে স্বাক্ষর করেছিল। আফজল তাঁর ৩১৩নং বয়ানে এই কথা স্বীকার করেছিলেন এবং একথাও বলেছিলেন যে মহাম্মদ নামক ওই ব্যক্তি তাঁর পূর্বপরিচিত। এই একটিমাত্র সাক্ষ্য নিরপেক্ষ এর সঙ্গে তদন্তকারী অফিসারদের সম্পর্ক নেই।

সুপ্রিম কোর্ট শওকতকে ১০ বছরের কারাদণ্ডের রায় দিল। কেন? কারণ, কোর্টের মতে ষড়যন্ত্র সম্বন্ধে শওকতের যা জানা ছিল, তা সে কোর্টের সামনে চেপে গিয়েছিল। শওকতকে ২০১১ সালে ছেড়ে দেওয়া হল। অতিসূক্ষ্ম অনুমানে যদি এটাও ধরে নেওয়া হয় যে গাড়ি কেনা সম্বন্ধে জানা মানে ষড়যন্ত্র সম্বন্ধে জানা এবং আফজল সেই জানাটুকু পুলিশকে যথাসময়ে জানাননি, তাহলে তাঁর কেসটা হয়ে দাঁড়ায় শওকতের মতো। তাহলে আফজল একজন মুক্ত মানুষ হয়ে যেতেন।

ট্রায়াল কোর্ট ও হাইকোর্টকে এই মুশকিলে পড়তে হয়নি, কারণ তারা ধরে নিয়েছিল স্বীকারোক্তি সঠিক এবং তা পারিপার্শ্বিক প্রমাণকে সমর্থন করেছে। হাতে পাওয়া স্বীকারোক্তির সমর্থনের জোর না থাকা সত্ত্বেও সুপ্রিম কোর্ট বস্তুত নিচুতলার কোর্টগুলোর সিদ্ধান্তেই পৌঁছেছিল এবং সেটা হল এই যে বিপক্ষের উকিল যখন সাক্ষীদের জেরা করে, তাদের কথা মিথ্যা প্রমাণ করতে পারেনি এবং আর সব বিষয় যখন একই আছে (তার মানে, বিপক্ষের উকিল কোনো পালটা সাক্ষ্য হাজির করতে পারেনি), তখন পুলিশ যা বলছে তাই ঠিক।

ট্রায়াল কোর্ট এবং হাইকোর্ট যে বিচারের ওপর নির্ভর করে রায় দিয়েছিল সেটা হল, ২০০০(সপ্তম)এডি(এসসি)৬১৩, গভর্নমেন্ট অফ এনসিটি অফ দিল্লি বনাম সুনীল, যেখানে বলা হয়েছিল :

যখন একজন পুলিশ অফিসার কোর্টের সামনে সাক্ষ্য দিয়ে বলেন যে অভিযুক্তর স্বীকারোক্তি মোতাবেক তিনি একটি বিশেষ জিনিস উদ্ধার করেছেন, তখন কোর্টের কাছে এই কথা বিশ্বাস করার পথই খোলা থাকে, যদি না অন্য কোনো রূপে এটাকে অবিশ্বাস্য মনে হয়। অভিযুক্তর দায়িত্ব ক্রসএক্‌জামিনেশন করে বা অন্য কোনো সাক্ষ্যর সাহায্যে প্রমাণ করতে হবে যে পুলিশ অফিসারের সাক্ষ্য বিশ্বাসযোগ্য নয় অথবা অন্তত পুলিশের এরূপ সাক্ষ্যর সত্যতা নিয়ে কোর্টের যদি সন্দেহ করার কোনোমাত্র কারণ থাকে, তাহলে তা নিশ্চিতভাবে এই যে কোর্ট দেখেছে ওই বিশেষ বস্তু উদ্ধারের সময়ে সত্যকারের কোনো নিরপেক্ষ ব্যক্তি উপস্থিত ছিল না।

একইভাবে সুপ্রিম কোর্ট যে কেসের উদাহরণ টেনেছে, সেটা হল সঞ্জয় বনাম এনসিটি [(২০০১)৩ এসিসিসি ১৯০] : উদ্ধার করার সময়ে কোনো নিরপেক্ষ সাক্ষী ছিল না, এই তথ্য সর্বদা তদন্তকারী অফিসারকে অবিশ্বাস করার ভিত্তি হতে পারে না। যুক্তিটা হচ্ছে, যদি স্বীকারোক্তি জবরদস্তিমূলক বলে তা প্রত্যাখ্যাত হল এবং যেহেতু স্বীকারোক্তির বিষয়গুলোর সঙ্গে উদ্ঘাটনগুলো মিলে গেল, তাহলে তো যেটা যথেষ্ট পরিমাণে ছিল তা হল, প্রচুর কারণ যার জন্য নথিভুক্ত তথ্যগুলোকে সন্দেহ করা যায় এবং এর ভিত্তি ছিল কোর্টের নিজস্ব যুক্তিগুলো। তাহলে তো কোর্ট আর অভিযুক্তর স্বীকারোক্তির সত্যতা সমর্থনের শক্তির ওপর(পড়ুন উদ্ঘাটনের ওপর) নির্ভর করতে পারত না। অন্যভাবে বললে দোষারোপ করার এই কেসটা ধসে যেত।

আফজলকে মরতে হবে

জোর দিয়ে বলা যায়, যদি কোর্ট পুলিশ ছাড়া অন্য কোনো নিরপেক্ষ সাক্ষ্যর ওপর নির্ভর করত, তাহলে কোনোভাবেই এমনকী যাবজ্জীবন কারাদণ্ডও দেওয়া যেত না। এইরকম একটা কাল্পনিক পরিপ্রেক্ষিতে কোর্ট বাধ্য হত হয় কয়েকবছরের জেল দিতে অথবা আফজলকে একেবারেই ছেড়ে দিতে যেমনটা আগেও বলেছি। নিচুতলার কোর্টের রায় উঁচুতলার কোর্টে একেবারেই উলটে দেওয়ার ঘটনাও তেমন কিছু অসাধারণ ঘটনা নয়। খুব সম্প্রতি বিহারে একটা গণহত্যার কেসে নিচুতলার কোর্টে অভিযুক্ত রণবীর সেনার তিনজনকে প্রাণদণ্ড এবং আটজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। হাইকোর্ট সেই অভিযুক্তদের খালাস করে দিয়েছে।

যাই হোক, পার্লামেন্ট আক্রমণের ঘটনায়, বিচারবিভাগীয় প্রক্রিয়া দণ্ডদানের সঙ্গে সঙ্গে সত্যিই শেষ হওয়ার ছিল না। এই কেসটা আইনের পথ ধরে এগিয়েই দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেলকে অপরাধীর কাঠগড়ায় তুলতে পারত। যেমনটা প্রবীণ আইনজীবী শান্তিভূষণ হাইকোর্টে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, তদন্তকারী অফিসাররা স্পষ্টতই যে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন তাতে আইপিসি ১৯৪ ও ১৯৫ ধারা অনুসারে তাঁদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া যায়। তিনি আরও বলেন, তদন্তকারী অফিসাররা যখন এমন বড়ো অপরাধ করে, তখন একমাত্র তাঁদের শাস্তি দিয়েই কোর্ট এই ধরনের মিথ্যা সাক্ষ্য ও বিকৃত তথ্য সাজানো বন্ধ করতে পারে।

বাস্তবে, দুর্ভাগ্যজনকভাবে, শান্তিভূষণের এইসব সঠিক পরামর্শ নিয়মিতভাবে অবহেলা করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসীবিরোধী যে বিশেষ ইউনিটটি গড়ে তুলেছে তাতে স্পেশাল সেল, বিচারব্যবস্থা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক এবং ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো ও রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইঙ্গের মতো সংস্থার মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলা হয়েছে। যদিও মিথ্যা অভিযোগে সাধারণ মানুষকে গ্রেপ্তার করার ভুরি ভুরি অভিযোগ স্পেশাল সেলের বিরুদ্ধে নথিভুক্ত হয়েছে যার মধ্যে এমন ঘটনাও আছে যে ধৃতকে বিচার চলাকালীনই বেকসুর খালাস দিতে হয়েছে, তবুও এই সংস্থার বিরুদ্ধে আজ পর্যন্ত কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

যাই হোক, পার্লামেন্ট আক্রমণের ঘটনা নিত্যকার সন্ত্রাসবাদী ঘটনার থেকে একেবারেই আলাদা। এই ক্ষেত্রে কেস সাজানোটা এমন ব্যাপক আকারের যে কোর্ট কোনোভাবে তা স্বীকার করলেই, স্পেশাল সেলের শাস্তি না হয়ে যেত না। এই ভয়ানক সম্ভাবনাকে কোর্ট কখনই অবশ্য স্বীকার করেনি। কাজেই কোর্টের যা পদক্ষেপ তার ফলাফল শান্তিভূষণের প্রস্তাবের ঠিক বিপরীত।

একটু গুছিয়ে নেওয়া যাক। প্রথম, কোনো একটা নিয়মতান্ত্রিক কারণ দেখিয়ে কোর্ট স্বীকারোক্তি প্রত্যাখ্যান করল, স্বীকারোক্তিতে কী আছে সে সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন না করেই; দ্বিতীয়, উদ্ঘাটনের ভিত্তিতে পুলিশ যেসব সাক্ষ্যপ্রমাণ পেশ করল, কোর্ট সেগুলোকেই বিশ্বাস করল; এবং তৃতীয়, ন্যায়বিচারের প্রশ্নে কোর্ট সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করল। যদিও প্রখ্যাত আইনজ্ঞের মতে ট্রায়াল কোর্টে সাক্ষ্যপ্রমাণ যাচাই করার পদ্ধতি আইনি ভাঁড়ামো হয়ে দাঁড়িয়েছিল। গোটা ছকটা ছিল এমন, যা একদিকে আফজলের মৃত্যুদণ্ডকে নিশ্চিত করেছিল, অন্যদিকে বিরাট কারসাজি করার অভিযোগ থেকে স্পেশাল সেলকে রক্ষা করা ফলপ্রসূ করেছিল। বাস্তবত, কোর্ট আফজল গুরুর কেস টপকে গিয়ে শওকতকে নতুন একটা অভিযোগে দোষী করে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছিল। তাছাড়াও কোর্ট অন্তত গভীর সন্দেহ প্রকাশ করেছিল যে গিলানি ওই ঘটনা জানতেন এবং তাঁর মৌনতা এরকম সন্দেহে সম্মতি জানাচ্ছে। এইসব করার ফলে স্পেশাল সেল যে গিলানি ও শওকতের কেস সাজিয়েছে, এই অভিযোগ থেকেও অব্যাহতি পেয়ে গেল।

বস্তুত, অভিযোগ গঠনের প্রক্রিয়ায় একটা অন্য জরুরি প্রশ্ন দেখা দিল। পার্লামেন্ট আক্রমণের ঘটনা যে শুধুমাত্র একটা সাধারণ বড়ো ধরনের অপরাধ ছিল তাই নয়, এর অনেক সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ছিল যার মধ্যে প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও সামরিক আক্রমণ, চলমান সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধ, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সংবেদনশীলতা, সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা, রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে চলা এরকম আরও বিষয় জড়িয়ে ছিল। অভিযোগ গঠনের প্রক্রিয়া যা করল, তা হল, কেসটার চূড়ান্ত দায় সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ব্যবস্থার অবশিষ্ট অংশের ঘাড়ে এমনভাবে চাপিয়ে দিল যাতে তারা তাদের ইচ্ছামতো ওইসব রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার প্রতিফলন তাদের বিচারে ঘটাতে পারে। এটা হতে পারত না যতক্ষণ না সংবিধানের ৭২নং ধারা টেনে এনে প্রাণদণ্ড দেওয়া যেত।

কোর্টের রায়ে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্ট নিশ্চিতভাবে বুঝেছে যে আইনের অনুশাসন কঠোরভাবে মেনেই এই কেসে মৃত্যুদণ্ড দেওয়াটাই সমীচীন। তবু, এর ফলাফল দাঁড়ালো এই যে সুপ্রিম কোর্ট যে আইনি দৃষ্টিভঙ্গি এই কেসে গ্রহণ করল তা ন্যায়সঙ্গত কিনা সেই প্রশ্ন সহ এই কেসটার সমস্ত ঘটনা খুঁটিয়ে দেখে বিচারবিবেচনা করার রাস্তা খুলে দিল। গোটা সমস্যার বোঝা রাষ্ট্রপতির ঘাড়ে গিয়ে পড়ল। ফলে, আইনত, তখনও আফজলের মুক্তি পাওয়ার একটা সম্ভাবনা ছিল।

কিন্তু আফজল, তাঁর পরিবার এবং পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের আফজলের শুভাকাঙ্ক্ষীরা যে আশা জিইয়ে রেখেছিল তা ঠিক বাস্তবানুগ ছিল না। সংবিধানের ৭২নং ধারায় যদিও আইনত প্রেসিডেন্টের হাতে ক্ষমতা প্রয়োগের সব পথই খোলা, তবে বাস্তব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি নির্ভর এই ব্যবস্থার হাত বাঁধা আছে ওই প্রাণদণ্ডের শাস্তিদানের দড়িতেই। প্রকৃতপক্ষে এই ব্যবস্থা, বিচার ব্যবস্থার প্রতি বিশ্বাসের চূড়ান্ত ক্ষতি না করে একজন দণ্ডপ্রাপ্তকে খালাস করে দিতে বা তার শাস্তি অনেকটা কমিয়ে দিতে পারে না। অতএব তখন সম্ভাব্য উপায় ছিল মৃত্যুদণ্ডের রায় না পালটানো অথবা সেটাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে পরিবর্তিত করা।

যাই হোক, যদিও রাষ্ট্রব্যবস্থার পক্ষে আফজলকে খালাস করে দেওয়া তত্ত্বগতভাবে সম্ভব ছিল, তবু ওই পরিস্থিতিতে ওটা ছিল একেবারেই অসম্ভব। কারণ ওই সিদ্ধান্ত শুধু বিচার ব্যবস্থারই ক্ষতি করত না, স্পেশাল সেলের কাণ্ডকারখানার নাটকীয় উন্মোচন ঘটাত। শেষ পদক্ষেপটি নেওয়া সম্ভব ছিল না। কারণ প্রবীণ আইনজীবী শান্তিভূষণের মতে, কিছু মানুষকে দোষী সাজিয়ে এমন একটা ষড়যন্ত্র চালানো হচ্ছে যাতে দেশটাকে পারমাণবিক যুদ্ধের দোরগোড়ায় ঠেলে দেওয়া যায়(তহলকা, ১৬ অক্টোবর ২০০৪, পৃ: ২১)। এই ষড়যন্ত্র যদি সত্যিই থেকে থাকে, তাহলে সরকারের উচ্চপদস্থ কিছু ব্যক্তির সরাসরি অংশগ্রহণ ছাড়া তা সৃষ্টি করা যায় না।

উদাহরণ হিসেবে, এটা অবিশ্বাস্য যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের থেকে কোনো অনুমতি না নিয়েই দিল্লি পুলিশের জুনিয়র এসিপি, রাজবীর সিং আফজলের স্বীকারোক্তি জাতীয় টেলিভিশনের পর্দায় দেখিয়ে দিল ২০০১ সালের ২০ ডিসেম্বর। আসলে তার আগেই সরকার আফজলের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে পাকিস্তানে ঘাঁটি গেড়ে থাকা সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে দিয়েছিল। যদিও শান্তিভূষণের বক্তব্য অনুসারে, যেহেতু আক্রমণকারীদের পাঁচজনই মারা গিয়েছিল, তাই পুলিশ এই হামলার ঘটনায় সন্ত্রাসীদের সম্পর্কে কিছুই খুঁজে বার করতে পারেনি। সরকারের একটা স্বীকারোক্তির দরকার ছিল। যদি ষড়যন্ত্র থেকে থাকে তাহলে তা পরিকল্পিত হয়েছিল সরকারি পরিচালকদের উচ্চতম স্তরে। কোনো সরকারই নিজেকে মারাত্মক বিপদে না ফেলে এই ধরনের একটা বড়ো অংশের সরকারি পরিচালকদের ঝামেলায় ফেলতে সাহস করবে না। নানা সরকার ক্ষমতায় আসে আর যায়। কিন্তু রাষ্ট্র ও রাষ্ট্র পরিচালন ব্যবস্থায় যারা নিয়োজিত তারা একই জায়গায় থেকে যায়। তারা খালি নজর রেখে যায়।

যদি আফজলের প্রাণদণ্ড যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে পরিবর্তিত হত, যদিও এটা একটা বানিয়ে নেওয়া ছবি, তাহলেও কী হত। শাস্তি ওইভাবে পালটে গেলে আফজল দ্রুত মুক্তি পেয়ে যেতেন। যেহেতু তাঁর জেলে কাটানোর মেয়াদ তখনই দশ বছরের বেশি পার হয়ে গিয়েছিল এবং সুশিক্ষিত কয়েদি হিসেবে কারাগারে তাঁর সুব্যবহারের যে নিখুঁত রেকর্ড ছিল তাতে অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি ছাড়া পেয়ে যেতেন।

সুপ্রিম কোর্টের হিসেবে, আফজল গুরু ছিলেন একমাত্র জীবিত ব্যক্তি যিনি পার্লামেন্ট আক্রমণের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সরাসরি কিছু জানতেন। ওপরের যুক্তিক্রম থেকে দেখা যাচ্ছে, ওই হামলায় আফজল জড়িত থাকার যে সিদ্ধান্তে সুপ্রিম কোর্ট পৌঁছেছিল তা ছিল এক বিরাট ভুল। কিন্তু এটা অবশ্যই ধরে নেওয়া যায় যে স্পেশাল সেলকে কেন্দ্রে রেখে সরকার যে ষড়যন্ত্র গড়ে তুলেছিল, তার এক বড়ো অংশের সাক্ষী ছিলেন আফজল। তাঁর দেওয়া ৩১৩নং বয়ানে তিনি সংক্ষেপে যা বলেছিলেন তাতে মনে হয় এই অন্ধকারাচ্ছন্ন ষড়যন্ত্র বিষয়ে তাঁর অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা বলার ছিল।

যাই হোক, আফজল গুরুর মৃত্যু অবধারিত ছিল। তাঁকে ফাঁসি দেওয়ার একমাত্র বাধা ছিল কাশ্মীরের অস্থির অবস্থা। তারপর, যখন কাশ্মীর একটু স্বাভাবিক হল এবং ভয়ানক শীতের ঠান্ডা সে রাজ্যের অধিবাসীদের ঘরের মধ্যে আটকে ফেলল, পার্লামেন্ট আক্রমণের কেসের রাজনীতি সবচেয়ে ভালো সুযোগ পেয়ে গেল। রাষ্ট্রীয় কারণে ২০১৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি আফজল গুরুকে ফাঁসি দেওয়া হল।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s