চিঠিপত্র : বিষয় : মেটিয়াবুরুজের বাংলাভাষার সংকট

বিষয় : মেটিয়াবুরুজের বাংলাভাষার সংকট

মন্থন সাময়িকীর মেজুন ২০১৩ সংখ্যায় আসরাফ আলি গাজি ও শাকিল মহিনউদ্দিনের লেখা মেটিয়াবুরুজের বাংলাভাষার সংকট নিবন্ধটা পড়ে কিছু ভাবনা উপস্থিত হয়েছে, সেগুলো প্রশ্ন আকারে রাখলাম$ এই বিষয়ে আরও বেশি যাঁরা জানেন, তাঁরা যাতে কিছু আলোকপাত করতে পারেন, সেই উদ্দেশ্যেই এই চিঠি$

মেটিয়াবুরুজের বাঙালি দর্জিসমাজের ভাষা, শব্দ ও উচ্চারণবৈশিষ্ট্য প্রসঙ্গে আলোচনা শুরুর সময়ে লেখকরা জানিয়েছেন ওখানকার মিশ্র জনগোষ্ঠী কীভাবে গড়ে উঠেছে তার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস এবং তার পরে তাঁরা বলেছেন, ফলে বাংলা, হিন্দি, আরবি, ফারসি, উর্দু, বর্মী, সিঙ্গাপুরি সমস্ত শব্দ মিশে একাকার হয়েছে এই জনসমাজের ভাষায়$ আর উচ্চারণবৈশিষ্ট্যে ও প্রকাশ ভঙ্গিমায় এই ভাষা এক স্বতন্ত্র্য মাত্রা পেয়েছে আমাদের মান্য কথ্য বাংলা থেকে$তারপরের লাইনেই লিখছেন, সুতরাং বিকৃতির ভাষা এই জনসমাজেরই সৃষ্টি$ সেই বিকৃতির ধারা এখনও বর্তমান$অর্থাৎ, মান্য কথ্য যে বাংলা, লেখকদেরই ভাষায়, যে বাংলাকে শিক্ষিত হিন্দুসমাজ অনুকরণ ও অনুধাবন সূত্রে নিজের ভাষার স্বকীয়তাকে গ্রহণবর্জনের মধ্য দিয়ে আরও সুচারুরূপে প্রতিষ্ঠিত করেছে, সেই বাংলা ভাষা থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে নিজেদের সীমাবদ্ধতাকে প্রকাশ করে মেটিয়াবুরুজ পৃথিবী নামক এক ভিনগ্রহের সনাতনপন্থী অধিবাসী হিসেবে স্বাতন্ত্র্যের পরিচয় দিয়েছে$পাশাপাশি তাঁরা দেখিয়েছেন, অথচ মেটিয়াবুরুজের পাশেই অবস্থিত সন্তোষপুর, আকড়া, চটা, চড়িয়াল অঞ্চলের মুসলিম জনগণ হিন্দু বাঙালিদের সংস্পর্শে নিজেদের ও নিজের কথ্য আঞ্চলিক ভাষাকে অনেকটাই শুদ্ধিকরণ করতে পেরেছে$

আমার প্রশ্ন উত্থাপন করতে অনেকখানি উদ্ধৃতি দিলাম পাঠকদের সুবিধার জন্য$ আমার প্রশ্ন হল, মান্য কথ্য বাংলা থেকে আলাদা হলে ভাষাকে বিকৃত বলা যায় কি? মান্য কথ্য বাংলার সীমা কতখানি? সুচারুরূপে ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করার হকদার কেবল আমাদের ওপরতলার শিক্ষিত সমাজ? বইয়ের ভাষাতেই ভাষার শুদ্ধিকরণ হবে? শহুরে ক্ষমতাবান বাবুদের অনুকরণে ভাষার সংকট দূর করা যায়?

মান্য কথ্য ভাষা বনাম বিকৃত ভাষা

বিকৃত উচ্চারণ ছাড়াও মেটিয়াবুরুজের কথ্যভাষায় এমন কতগুলি বিভাষাকে ব্যবহার করতে দেখা যায় যার কোনো মাথামুণ্ডু নেইএই মন্তব্যের সঙ্গে সঙ্গে লেখকরা যেসব উদাহরণ দিয়েছেন, তার মধ্যে কতকগুলো শব্দ স্থানীয় টানে রূপ পাল্টে ফেললেও সবাই মোটামুটি বোঝে যেমন, তেলপেঁয়াজকে ত্যালপ্যাজ বলা, যাবি নাকরবি নাকে যাবিনিকরবিনি বলা (সিনেমায় কালীসাধক কালীর মূর্তির সামনে হাতে খাবার নিয়ে বলছেন মা তুই খাবিনি), গেছেকরছেমারছেকে গেসেকোত্তেসেমারতেসে বলা (বাঙালিরা অনেকেই বলে)$ কিছু শব্দ মান্য কথ্য বাংলাতে অভিধানেও পাওয়া যায়, যেমন চিজ, খুলি (ছোটো পাত্র হিসেবে)$ বাকি শব্দগুলো স্থানীয় বাংলাভাষার মধ্যে যেসব বিদেশি শব্দ এসে মিশে গেছে তাদের মিশ্রণ বা অপভ্রংশ হতে পারে$ যেমন নিবন্ধে মারণব্যাধি অর্থে বড়াজার শব্দের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে বিভাষা হিসেবে$ ওটা যে একদম হতে পারে না, তা নয়$ বাংলা অভিধানে জার শব্দের যে নানা মানে দেওয়া আছে তার মধ্যে জর্জরিত হওয়া বা শুকিয়ে যাওয়াও আছে$ ব্যাকরণের এতসব নিয়ম নিয়ে ধরা যাক মাথা ঘামালাম না$ কারণ, ব্যাকরণ কেমনভাবে মানব বা মানব না তা নিয়েও মতভেদ আছে$ যাই হোক, ওই শব্দগুলো আকাশ থেকে পড়েনি এবং ওগুলোর মানে স্থানীয় মানুষেরা যদি নিজেদের মধ্যে বুঝতেই পারে, তাহলে ওগুলোকে আঞ্চলিক ভাষা হিসাবে গ্রহণ করে নিলে বিকৃতির তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না; বরং মান্যকথ্যবাংলার সীমানা আরেকটু বিস্তৃত হয় এবং বাংলাভাষা আরও সমৃদ্ধ হয়$ এখানে উল্লেখ্য আলোচ্য নিবন্ধে ভাবের আদানপ্রদান ও সাহিত্যসংস্কৃতি চর্চার মাধ্যম হিসেবে কলকাতার কথ্যভাষাকে মান্য ভাষার মর্যাদা দেওয়া মেনে নেওয়া হয়েছে$ কিন্তু আঞ্চলিক যে ভাষার কথা ওখানে বলা হয়েছে সেই ভাষা ছাপার অক্ষরে বইয়ের মধ্যে এলেও অসুবিধা কী? বাংলা সাহিত্যে এমন ভুরি ভুরি উদাহরণ আছে$ তারাশঙ্করের লেখায় রাঢ়ি ভাষা বা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মানদীর মাঝিতে পূর্ববঙ্গীয় বাঙালি ভাষা আমরা অনেক আগেই পেয়েছি$ এমনকী সত্তরআশি বছর আগেই মণীশ ঘটকের রচিত কুড়ানি কবিতার শেষ চার লাইন বাদে সবটাই পূর্ববঙ্গীয় ভাষায় লেখা হওয়াতেও সাহিত্যসংস্কৃতি চর্চার কোনো অসুবিধা হয়নি$ পাঠকদের যে একেবারে অসুবিধা হয় না, তা নয়$ যেমন, বাংলাদেশের আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের লেখা পড়তে শুরু করলে প্রথমটায় দুচারটে শব্দ বুঝতে অসুবিধা হয় যদি পাঠক অন্য অঞ্চলের হয়$ খানিক পরে কিন্তু ওই শব্দের বারংবার ব্যবহারে একটা অর্থ করে নেওয়া যায়$

কথ্য ভাষা আর বইয়ের ভাষা

সাহিত্যে যা চলে, সকলের জন্য পাঠ্যবইতেও কি তা চলতে পারে? এরকম একটা প্রশ্ন এখানে এসেই যায়$ সে ক্ষেত্রে প্রবেশ করার আগে বলি, অন্য অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে সংযোগের ক্ষেত্রে মেটিয়াবুরুজের মানুষের ভাষা অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় এমন একটা কথা লেখকরা বলেছেন$ আমি ব্যক্তিগতভাবে মেটিয়াবুরুজের অল্পকিছু মানুষের সঙ্গে কথা বলে তেমন অসুবিধা বোধ করিনি$ হতে পারে, ওখানকার দর্জিদের সঙ্গে অন্তরঙ্গভাবে মেশার সুযোগ আমার হয়নি বলে আমি বুঝতে পারছি না সমস্যা কোথায়$ তবে এরকম সমস্যা পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য অঞ্চলে ঘুরতে গিয়েও হয়েছে$ সেখানে বিশেষ আঞ্চলিক শব্দের মানে বুঝে নেওয়ার জন্য আমাকে আবার প্রশ্ন করে বুঝে নিতে হয়েছে বক্তার বক্তব্যটা কী$ তাতে আমার মনে হয়েছে, এই তো আরও কত শব্দ আছে বাংলায়, সেগুলো শিখে নিলাম$ কখনই মনে হয়নি ওই ভাষা ওই অঞ্চলের জীবনধারার জড়তা বা প্রকাশঅক্ষমতাকে তুলে ধরছে$

যে নিবন্ধ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে তার লেখকেরা মেটিয়াবুরুজ অঞ্চলের কিছু শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে বুঝেছেন যে দর্জিসমাজের ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া শিখতে না পারার একটা কারণ পাঠ্যবইয়ের সঙ্গে আঞ্চলিক ভাষার সাযুজ্য না থাকা$ এরকম একটা অভিজ্ঞতা আমারও হয়েছিল নদিয়ার তেহট্ট অঞ্চলের বাংলাদেশ সীমানাবর্তী একটা স্কুলে গিয়ে$ তাতে আমি যা বুঝেছিলাম সেটা একটু উল্টোরকম$ অর্থাৎ, এই যে কেতাবি ভাষা এর মধ্যেই একটা গণ্ডগোল আছে$ বইগুলো লেখা হয় কলকাতার ভাষায় কলকাতার পরিবেশে$ এরকম একটা কেন্দ্রীয় ব্যবস্থায় তৈরি হওয়া বই পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলের ছাত্রছাত্রীদের হাতে পৌঁছালেও তাদের সঙ্গে কোনোরকম সংযোগ তৈরি করতে পারে না$ সেখানে ভাষার একটা সমস্যা আছে বটে$ তবু তা এত বড়ো নয়$ বাংলাভাষাই তো$ বরং ইংরেজি মাধ্যমে যারা পড়ে, তাদের একটা বড়ো অংশের ভাষার সমস্যা বিজ্ঞানঅঙ্কের মতো যৌক্তিক বিষয়কেও কঠিন করে তোলে এরকম অনেক দেখেছি$ সবচেয়ে বড়ো কথা হল, বইয়ের পাতায় যে বিষয়গুলো নিয়ে লেখা থাকে সেগুলো ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে পারে না বলেই বিষয়শিক্ষা ওপর ওপর হয়$ উদাহরণ হিসেবে, যে স্কুলের উল্লেখ করলাম সেখানকার ভূগোল ক্লাসে ফোরের ছাত্রছাত্রীদের জিজ্ঞেস করলে তাদের চল্লিশজনের মধ্যে দুএকজন বলতে পারে (বই থেকে মুখস্থ করে) পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিমে কী আছে$ কিন্তু একজনও বলতে পারে না তাদের স্কুলের উত্তরদক্ষিণ ইত্যাদি দিকগুলো কোথায়? আবার সূর্য কোন দিক থেকে ওঠে প্রশ্ন করায় দুচারজন কিন্তু সীমান্তের দিকে হাত দেখিয়ে সঠিক উত্তর বলতে পারে$ উদাহরণ আর না বাড়িয়েও কিন্তু বলা যায়, যে প্রথাগত শিক্ষা আমরা স্কুলের মধ্য দিয়ে পেয়ে আসি সেই শিক্ষাই কি বইয়ের ভাষা বলে যা চালু আছে তাকেই একঢালাভাবে সকলের অনুকরণের যোগ্য এবং ভাষার সংকট মোচনের উপায় হিসাবে ভাবাচ্ছে না?

ভাষা : কথ্যঅকথ্য

আলোচ্য নিবন্ধে আঞ্চলিক কথ্যভাষায় খিস্তিখেউড়ের বাড়াবাড়ি নিয়ে বলা হয়েছে। বাচ্চাবড়ো সকলেই কথায় কথায় গাল দেয় বা মহিলাদের সামনেও অশ্লীল ভাষা প্রয়োগ করে এটা তো শুধু এই অঞ্চলে নয়। আমি তো দেখি কলকাতা শহরের মধ্যিখানে, যেখানে আমার বাসা, সেই অঞ্চলের ভাষাও গালাগালিতে কিছু কম যায় না। পাশের বাড়িতে গণ্ডগোল লাগলে (যা প্রায় রাতেই হয়ে থাকে) ছেলে মাকে গাল দেয় গাল মানে খিস্তি, মোড়ের মাথায় আমারই ছোটোবেলার বন্ধুরা সন্ধ্যেবেলায় কাজ থেকে বিশ্রাম পাওয়ার আহ্লাদে যে ভাষায় পরস্পরকে সম্বোধন করে তা লেখা যায় না, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিনে বা ছাত্রদের আড্ডায় গেলে শোনা যায় সুশিক্ষিত ছেলেরা নোংরাতম খিস্তি দিয়ে স্মার্টনেস ফলাচ্ছে এবং কোনো ক্ষেত্রেই মহিলাদের উপস্থিতিকে আলাদা সমীহ করার বিষয় মনে করছে না। আরেক অংশের মহিলারাও, বিশেষত যারা খেটে খায়, তারা রেগে গেলে খিস্তি দেবে না? তো কী দেবে? সমাজের হিংস্র চাপে পীড়িত এদের বিক্ষুব্ধ মন এইসব মূঢ়ম্লানমূক মুখে আর কোন ভাষার জোগান দেবে? খিস্তি কথ্য থেকে লিখিত সাহিত্যে, হলভরা দর্শকের কাছে নাটকের দৃশ্যে দৃশ্যে শ্রুত হয়ে হাততালি পাচ্ছে। ফ্যাতাড়ু নাটক দেখতে গেলে এটাই দেখতে পাবেন যে দৃশ্যে খিস্তি শুধু সেই দৃশ্যেই কমবয়সি দর্শকরা হাততালি দিয়ে হল ফাটিয়ে দিচ্ছে। অতএব, অকথ্য ভাষা বা গালাগাল মোটেই আঞ্চলিক ঘটনা নয়, এমনকী দুর্ঘটনা বলা যাবে কিনা তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। এটাকে একটা সমস্যা আকারে দেখলে এর আলাদা সমাধান কী হয় তা জানি না, তবে মান্যকথ্যবাংলাভাষা চর্চাই যে এর একমাত্র শুশ্রূষা নয় সেটা বলাই যায়। কারণ অসুখটা ঠিক ভাষার বা তার অভাবের নয়, মনোভাবের।

ভাষার সংকট

ভাষার সংকট নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে নিবন্ধে সংকটের ফলাফল হিসেবে বলা হয়েছে, সংকীর্ণ মনোভাব প্রকাশ পাবে মৌলবাদীরা যার সুযোগ নেবে$ এবং যুগের পরিবর্তনগুলোকে খাপ খাওয়াতে না পেরে ক্রমশ হারিয়ে যাবে$ এখানে একটা কথা বলা দরকার যে সংকীর্ণ মনোভাবমৌলবাদ সামাজিক সংকট$ এগুলোর সঙ্গে ভাষার সংকটের সম্পর্ক থাকলেও তা নির্ধারক নয়$

আর সংকটের সমাধান হিসেবে বলা হয়েছে পরিবারের মধ্যে ছোটোদের সঙ্গে মান্য কথ্য ভাষায় কথা বলতে যাতে তারা সেই ভাষায় কথা বলতে অভ্যস্ত হয়$ এটা বাস্তবে কতটা সম্ভব? আমি অবশ্য উল্টোটাই দেখেছি$ কাজের জায়গায় পোশাকি ভাষায় কথা বলা আর বাড়ি ফিরে নিজস্ব দেশি বা আঞ্চলিক ভাষায় পরিবারের লোকজনের সঙ্গে আলাপ$ এতে কোনো অসুবিধা আছে বলে মনে হয় না$ ভাষা খুবই সার্থকভাবে চর্চা করেন এরকম বাঙাল কবিসাহিত্যিককেও ওরকমই দেখেছি$

নিবন্ধে পোশাকি বাংলাভাষার প্রতি আন্তরিকতা ও দায়বদ্ধতার কথা এসেছে$ আমার মনে হয়, কলকাতার ভাষাকেই সর্বজনমান্য কথ্য ভাষা করে তোলাতেও কিন্তু এক ধরনের মৌলবাদ জন্মাতে পারে$ এই ধরনের শিক্ষিত মৌলবাদীদের দেখেছি আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য হাসাহাসি করতে$ এদের মধ্যে একটা দল মনে করে ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করা এবং বাংলাভাষাকে এলেবেলে করে রাখাটা বেশ কাজের, যেরকমটা পশ্চিমবঙ্গে অল্পাংশে চালু ও বহুলাংশে কাম্য হয়ে আছে এবং এটাকেই যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো বলা হচ্ছে$ আবার আরেকটা দল মনে করে বাংলাভাষাতেই সব কাজ চালাতে পারলে সবাই তরতর করে এগিয়ে যাবে, বাংলাদেশে কিন্তু তা হয়নি$ ওখানে সরকারি সব কাজ বাংলাতে হলেও, বেশিরভাগ মানুষের জীবনটাই যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পেরে ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে$

সব মিলে যা মনে হয়, আসলে এই সমস্ত ভাষার ওপরেও আরেকটা ভাষা আছে ক্ষমতার ভাষা$ সে ভাষায় না আছে ইংরেজি, না বাংলা$ না আছে তার মান্য কথ্য রূপ অথবা আঞ্চলিক আদল$ এটা বুঝে নেওয়া খুব দরকারি আর তার জন্য প্রয়োজন চালু যা কিছু আছে ভাষা, ভাষার রাজনীতি, শিক্ষার বিষয় ও পদ্ধতি বা যুগের পরিবর্তনের ধারণা সহ সমস্ত কিছুকেই প্রশ্ন করা$ না হলে ভাষার সংকটের স্বরূপ আমরা ধরতে পারব না$

২৭ জুলাই ২০১৩তমাল ভৌমিকভবানীপুর, কলকাতা

শাকিল মহিনউদ্দিনের প্রত্যুত্তর

পত্রলেখকের গঠনমূলক আলোকপাত বেশ প্রশংসনীয়, তাঁকে সাধুবাদ জানাই। এরপর খোলাখুলিই বলতে চাই, বাংলাভাষার প্রতি বাঙালি দর্জি সমাজের অনীহা, ঔদাসীন্য ও আন্তরিকতার অভাবকে তুলে ধরতেই উক্ত নিবন্ধের অবতারনা। বাঙালি অথচ তার মাতৃভাষার বোধ থাকবে না, মান্য শব্দের মান্যতা দেবে না, বোঝার জন্য সময় খরচ করবে না, ভাবলেশহীন মনোভাব ব্যক্ত করবে এই দিকটায় আলোকপাত করার চেষ্টা করা হয়েছে।

পত্রলেখক বিকৃত ভাষা প্রসঙ্গে যা বলেছেন, তার উত্তরে বলতে চাই, মান্য কথ্য বাংলা থেকে আলাদা বলে বিকৃত বলা হয়নি, উদ্ভট উচ্চারণবৈশিষ্ট্য সম্পন্ন ভাষা বা শব্দ যা বেশ কর্কশ এবং শ্রুতিকটূও বটে। অনেকটা ইচ্ছাকৃতভাবেই উচ্চারণের প্রলম্বিত টান এখানকার শব্দগুলোকে বিকৃত করেছে। বিকৃত শব্দ মোটেই কাম্য নয়, বর্জনীয়। কারণ বিকৃত শব্দ দ্বারা ভাষা বা শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ হয় না।

বিভাষার উদাহরণ হিসেবে সড়পা, সাংড়ি, আজিমোজি, একচালান, একঘড়ি, ধ্যারাং ইত্যাদি শব্দগুলোর অর্থ দর্জি অঞ্চলের বাইরে কেউ বোঝে না। যে শব্দ বাইরের কারোর সঙ্গে ভাবপ্রকাশে সাহায্য করে না, বরং অসুবিধার সৃষ্টি করে তা না বলাই উত্তম।

বিশেষভাবে উল্লেখ্য, দর্জি অঞ্চল বৃহত্তর মেটিয়াবুরুজের একটি অংশমাত্র। পত্রলেখক হয়তো মেটিয়াবুরুজের আলোকপ্রাপ্ত কোনো কোনো মানুষজনদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে থাকবেন। দর্জি সমাজের ভাষা চললে ক্ষতি নেই। কিন্তু স্থানকালপাত্র ভেদে কোন ভাষা ব্যবহার করা উচিত তা অনেকেই অজ্ঞতার কারণে জানে না। একটা জড়তা ভাবের লেনদেনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এলাকার মানুষজনের সামগ্রিক বৌদ্ধিক বিকাশকেও যা ব্যাহত করে। ভাষা নিয়ে এখানকার মানুষের মত বিনিময় প্রায় শূন্যই বলা চলে। বাড়ি বা তার আশেপাশে, শ্রেণীকক্ষে মাস্টারমশাই কোনো শব্দের বা ভাবের অর্থ পরিষ্কার করতে হাজারটা শব্দ বললেও তারা মনে রাখতে পারে না। স্রেফ চর্চার অভাব বলে। মাস্টারমশাইও দর্জি ভাষায় সেগুলোর ভাষান্তর ব্যবহার চায় না, নিজে লজ্জাবোধ করে, পাছে কেউ টিটকারি করে। এটা কোন ধরনের মানসিকতা? যত্রতত্র দর্জি ভাষার ব্যবহার অহমিকাহামবড়াই মনোভাবকেই প্রকাশ করে। দেখাতে চায় আমরা আমরাই। দর্জি মানুষগুলো মেটিয়াবুরুজের পৃথিবীতে জীবনটাকে গণ্ডীবদ্ধ করে রাখবে? মনে রাখতে হবে পৃথিবীটা প্রতিনিয়ত পাল্টাচ্ছে। সেই পাল্টানো প্রতিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর দরকার নেই? বাইরে পথেঘাটে বের হতেই হবে। তাই মান্য শব্দ শিশুকাল থেকে রপ্ত করার কথা বলা হয়েছে।

পত্রলেখকের অপর একটি প্রশ্নের উত্তরে বলতে হয়, বাংলাভাষা অঞ্চলভেদে আঞ্চলিক রূপলাভ করেছে। একই উপভাষা ব্যবহারকারী অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে ভাষার পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। সেই কারণে যে কোনো ভাষার একটি প্রমাণভাষাকে মাধ্যম করে শিক্ষাসংস্কৃতি এগিয়ে চলে। যদিও আঞ্চলিক ভাষার রূপগুলিকে নিয়েও শিক্ষাসংস্কৃতি এগিয়ে চলতে পারে। আঞ্চলিক ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর মধ্যেও পৃথক বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায় বলে কোনো এক জনগোষ্ঠীর ভাষাকে মান্য ভাষা ধরে সাহিত্যশিক্ষা এগিয়ে চলে। যদিও সাহিত্য আঞ্চলিক ভাষায় হতেই পারে। কিন্তু শিক্ষাপ্রদান সম্ভব নয়। যেমন ধরা যাক, রাঢ় উপভাষার কথা। মেদিনীপুরের ভাষার সঙ্গে নদিয়ার, দক্ষিণ ২৪ পরগনার সঙ্গে উত্তর ২৪ পরগনার বা কলকাতার ভাষার পার্থক্য লক্ষিত হয়। তাহলে কোন ভাষায় পাঠ্যপুস্তক রচিত হবে?

পত্রলেখক যদি এখানকার দর্জি জনবসতির ছোটোবড়োদের ভাষা নিজ কানে শুনতেন, বোধহয় ভালো হত। অশিক্ষিত, এমনকী স্বল্পশিক্ষিত মানুষজন মহিলাপুরুষের বাছবিচার না করে কীভাবে নানা টাইপের খিস্তি খেউড়ে বাংলাভাষার শব্দভাণ্ডারকে দিনে দিনে সমৃদ্ধ করে চলেছে, তিনি কিছুটা হলেও উপলব্ধি করতে পারতেন।

সম্পাদকের মন্তব্য

আলোচিত বিষয়টির মধ্যে এমন কিছু তর্ক সৃষ্টি হয়েছে, যা আরও বৃহত্তর পরিসরে আলোচনা হওয়া দরকার। আশা করি, পাঠকমণ্ডলী এব্যাপারে উদ্যোগী হবেন।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s