তিস্তা জলবন্টন নিয়ে আলোচনাসভার প্রশ্নোত্তর

উত্তরগুলি দিয়েছেন দেবাশিস সেনগুপ্ত।

নদীর অববাহিকা তো সাধারণত উজান থেকে ভাটির দিকে চওড়া হতে থাকে, তিস্তার ক্ষেত্রে অন্যরকম কেন?

নদীর খাত ক্রমশ চওড়া হয় ভাটির দিকে। অববাহিকা সাধারণত ভাটির দিকে সরু হয়, যদি না নিম্নগতিতে নদী শাখাপ্রশাখায় বিভক্ত হয়ে বদ্বীপ তৈরি করে। তিস্তার ক্ষেত্রে এটাই হয়েছে, সে শাখাপ্রশাখায় বিভক্ত না হয়ে নিজেই সোজা গিয়ে ব্রহ্মপুত্রে মিশেছে$

বর্ষা ও শুকনো সময়ে তিস্তার দৈর্ঘ্যে কতটা তফাত হয়?

বর্ষায় নদী যে খাত দিয়ে বয় তা অনেক সোজা, শুকনো সময়ে তার চেয়ে সরু খাত ধরে এঁকেবেঁকে যায়$ দুই দৈর্ঘ্যে কতটা তফাত, নির্দিষ্ট করে বলতে পারব না$ তফাতটা বেশি হয় নদীর নিম্নগতিতে$ সারণিতে তিস্তার যে দৈর্ঘ্য দেওয়া আছে, তা শুকনো সময়ে উপগ্রহের তোলা ছবির ভিত্তিতে মাপা$

তিস্তা থেকে মহানন্দা খালের গতিপথে তো অনেক নদী পড়ে, খাল সেগুলি পেরোয় কীভাবে?

নদী বা ঝোরা পার করানো হয় খালের তলায় বানানো সুড়ঙ্গ (ভায়াডাক্ট) দিয়ে$ এই নদীগুলি জমির সাধারণ ঢাল অনুযায়ী উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে বয়, আর খালের জল বয় পুব থেকে পশ্চিমে$ তবে বর্ষার সময় অজস্র নালা জলে ভরে ফুলে ওঠে, তাদের জল খালপারের বাঁধে আটকাবে$ তখন গোটা খালটাই যেন একটা বাঁধ$ খালপারের রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে উত্তর দিকে বর্ষার জলের ড্যামেজের নিদর্শন চোখে পড়ে$ দেখে মনে হয় নিকাশির জন্য ভায়াডাক্ট যথেষ্ট নয়$

তিস্তা প্রকল্প এলাকায় সেচসেবিত জমির প্রসার সত্ত্বেও খরিফ চাষের এলাকা সংকোচন হল কেন?

একটা কারণ হতে পারে খালের উত্তর পারের বাঁধে আটকে জল দীর্ঘকাল জমির ওপর দাঁড়িয়ে থাকার ফলে সেই সব এলাকায় খরিফ চাষ ঠিক মতো হতে পারেনি। তবে এ ছাড়া অন্য কারণও থাকতে পারে।

(বলাই চক্রবর্তীর মন্তব্য) সেচসেবিত জমির আসল পরিমাণ সরকারি হিসাবের থেকে কম হতে পারে। তিস্তা প্রকল্পের কাজে প্রচুর দুর্নীতি হয়েছে, টাকাপয়সা নয়ছয় হয়েছে।

ছবিতে তিস্তার প্রবাহ আর খালপথে সরানো জলের পরিমাপ মিলিয়ে মনে হচ্ছে শুকনো মরসুমেও নদীর সবটা জল ব্যবহার করা হয়নি সেচের জন্য; বড়ো জোর অর্ধেক নেওয়া হয়েছে। কেন?

সবচেয়ে শুকনো সময়ে নদী থেকে সরিয়ে নেওয়া জলের পরিমাণ আসলে ৮০ শতাংশের মতো। তিস্তা ব্যারাজ কর্তৃপক্ষ জল মাপে একটু পরোক্ষ ভাবে তাতে সোজাসুজি মাপের থেকে একটু কম আসে। খালের জলের হিসেবটা আছে ব্যারাজ কর্তৃপক্ষের মাপে, সোজাসুজি মাপা হলে আর একটু বেশি হত। তা ছাড়া, প্রবাহের হিসেবটা হল বুড়িগ্রাম সীমান্তের, ব্যারাজ থেকে সেই পর্যন্ত যেতে নদীতে জল একটু বাড়ে। সেই বাড়তি জলটা ব্যারাজ থেকে নেওয়া যায় না।

তিস্তা নদী শুকিয়ে যাওয়ায় ঠিক কতখানি এলাকায় মাটির জলস্তর নেমেছে?

গাজলডোবার ভাটিতে জলপাইগুড়ি জেলার চারটি ব্লকে জলস্তর নামতে দেখা গেছে। সবটাই নদী শুকিয়ে যাওয়ার জন্য নাও হতে পারে। অববাহিকার অনেকখানি অংশে খালের জল পৌঁছায়নি, সেখানে নদী শুকিয়ে যাওয়ার প্রভাব সোজাসুজি পড়েছে। যেখানে পৌঁছেছে সেখানেও জল পর্যাপ্ত না হওয়ায় ঘাটতি সেচের কাজ মাটির জলে হয়েছে।

তিস্তার জলের ভাগ চুক্তি হতে গেলে নদীর জলের সুবিধাভোগী কতজন কোন দেশে আছে সেই প্রসঙ্গ ওঠে। আইনত কারা আসতে পারে এই হিসাবে?

প্রবন্ধের সারণিতে অববাহিকায় বসবাসকারী লোকসংখ্যা দেওয়া হয়েছে। তবে ইউএন কনভেনশন অনুযায়ী, শুধু অববাহিকাবাসী নয়, নদীর জলের ওপর যারা নির্ভর করে সেই সমগ্র জনগোষ্ঠী আসবে হিসেবের মধ্যে। ভারত ও বাংলাদেশ দুই সরকারই তিস্তা অববাহিকার বাইরে সেচের জল পৌঁছে দিয়ে সেখানকার মানুষজনকে হিসেবের মধ্যে আনার চেষ্টা করে। গাজলডোবায় তিস্তার পশ্চিম দিকে ঠিক মতো জল পৌঁছে দিতে না পারা সত্ত্বেও ২০১২ সালের জানুয়ারি মাসে পুব দিকের খাল খুলে দেওয়া এমনই একটি উদ্যোগ।

এলাকার লোক কী চাইছে? ফরাক্কার ব্যারাজের মতো তিস্তা ব্যারাজের পেছনেও কি স্থানীয় সমর্থন নেই?

এলাকার লোকেদের মতামত নিয়ে কোনো সমীক্ষার কথা জানি না। যেখানে খালের জল পৌঁছেছে, সেখানে প্রকল্পের পেছনে কিছু জনসমর্থন তো থাকবেই। সুবিধাপ্রাপ্তদের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য এখন সরকার উঠে পড়ে লেগেছে। অনেকেই অল্প সুবিধা পায়, সেচের পুরো জলটা পায় না। তবু ব্যারাজ থেকে জল আসা বন্ধ হলে তাদের তাৎক্ষণিক স্বার্থহানি তো হবেই। অন্যদিকে ব্যারাজের বিরোধিতাও কম নেই। কারো জমি দিতে হয়েছে বলে রাগ। কেউ ক্ষতিপূরণ পছন্দমতো পায়নি। নদী শুকিয়ে যাওয়ায় আর মাটির জলস্তর নেমে যাওয়ায় বিপদে পড়েছে অনেকে। জলপাইগুড়ি ও হলদিবাড়ির বহু মানুষ এর মধ্যে আছে।

তিস্তায় কতটা জল বইতে দিলে পরিবেশ অনুকূল প্রবাহ থাকবে?

তিস্তা নদীতে এ নিয়ে কোনো নির্দিষ্ট সমীক্ষার কথা জানি না। অন্য দেশে অন্য নদীতে সমীক্ষা হয়েছে। এরকম অনেকগুলি সমীক্ষার ফলাফল একত্রে সংকলিত করে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর দি কনজারভেনশন অফ নেচারএর একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, পরিবেশ রক্ষায় নদীর যে বিচিত্র ভূমিকা আছে, তার এক একটির জন্য বছরের যে কোনো সময়ে তখনকার স্বাভাবিক প্রবাহের ৬৫ থেকে ৯৫ শতাংশ দরকার হয়। মাঝামাঝি একটা হিসাব ধরলেল স্বাভাবিক প্রবাহের অন্তত ৮০ শতাংশ বজায় রাখতেই হবে, না রাখাটা হঠকারী কাজ হবে।

বিদেশি হিসেবে আমরা মানব কেন? শুনেছি পরিবেশ অনুকূল প্রবাহের হিসেব করা হয় সামন বা কড মাছ ধরার বাণিজ্যিক স্বার্থের বিচারে। সেই বিচার দিয়ে আমরা কী করব?

সত্যি কথাটা হল, কতটা জল তিস্তায় লাগবে পরিবেশ অনুকূল প্রবাহের জন্য, তা আমরা কেউ জানি না। যতদিন না সেই ধারণা আমাদের হচ্ছে, ততদিন বাড়তি সাবধানতা দরকার।

যদি এতখানি জল নদী দিয়ে যেতে দেওয়া হয়, তাহলে তো ব্যারাজটারই দরকার নেই সেটা ভেঙে ফেললেই হয়?

ভেঙে না ফেললেও সব গেটগুলো খুলে রাখা যেতে পারে অধিকাংশ সময়।

(মন্তব্য) খুলে রাখলে হবে না। নদীর একটা বড়ো কাজ পলি বয়ে নিয়ে যাওয়া। ব্যারাজ থাকলে তার গেট খোলা থাকুক বা বন্ধ পলি সেখানে আটকে যাবে। ব্যারাজটাই ভেঙে ফেলা দরকার।

(সমর বাগচির প্রশ্ন) ইউরোপ আমেরিকাতে প্রচুর বাঁধ ডিকমিশনিং হচ্ছে বছর বছর। ভারতবর্ষে একটাও বাঁধ ভাঙা হয়েছে কি?

সেরকম হয়েছে বলে আমার জানা নেই।

(সমর বাগচির মন্তব্য) আমি ভাবছি, রবীন্দ্রনাথ কত দিন আগে বাঁধ ভাঙার কথা লিখে গেছেন মুক্তধারায়। সেখানে শিবতরাইয়ের চাষিদের কথা যা বলা হয়েছে, তা আজকের চাষিদেরও সমস্যা।

(পরমেশের মন্তব্য) ভারতবর্ষে বাঁধ ভাঙা হয়েছে ওই একটাই ১৯২২ সালে!

শুনেছি কেন্দ্রীয় সরকার মমতা ব্যানার্জিকে বাদ দিয়ে সোজাসুজিই চুক্তি করছে বাংলাদেশের সঙ্গে?

এরকম কিছু হয়ে গেছে বলে শুনিনি। গোপনে কিছু হওয়া সম্ভব নয়। চুক্তি হলেই তো হল না, সেটা রূপায়ণ করা পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে বাদ দিয়ে হবে না। ব্যারাজের নিয়ন্ত্রণ তো পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সেচ দপ্তরের হাতে।

কেন্দ্রীয় সরকার তিস্তা ব্যারাজ অধিগ্রহণ করে চুক্তি রূপায়ণ করতে পারে না?

কেন্দ্ররাজ্য ক্ষমতা ভাগাভাগির নির্দিষ্ট এলাকা আছে। তা অতিক্রম করতে গেলে আইনি জটিলতা থাকবে, রাজনৈতিক জটিলতাও। অধিগ্রহণ সম্ভব বলে মনে হয় না।

নদী দিয়ে জল যদি বইতে দেওয়াই হয়, তা হলে আর চুক্তির কী দরকার?

চুক্তিতে বাঁধা পড়লে কোনো দেশের সরকার চাইলেও নদীর জল ইচ্ছেমতো সরাতে পারবে না।

নদীর জল একবার সীমানা পেরিয়ে বাংলাদেশে ঢুকলে তা নিয়ে সেদেশের সরকার কী করছে সেটা তো তাদের ব্যাপার। চুক্তি করে তা নিয়ন্ত্রণ করা যায় কী?

অবশ্যই যায়। নেপালের সঙ্গে মহাকালী (সারদা) নদী নিয়ে ভারতের একটা চুক্তি আছে, তাতে দশ কিউমেক জল সারা বছর নদী দিয়ে বইতে দেওয়ার সংস্থান আছে। ভারত সরকার সেই চুক্তিতে বাঁধা। দশ কিউমেক জল বইতে দেওয়া যদি চুক্তির শর্ত হতে পারে, তা হলে বছরের যে কোনো সময়ে সেই সময়ের স্বাভাবিক প্রবাহের ৮০৯০ শতাংশ ছাড়তে দেওয়া বা শর্ত না হতে পারে কেন? বাংলাদেশ সরকার তাতে দায়বদ্ধ থাকবে।

তিস্তা ব্যারাজ থেকে দুই দেশেই সাধারণ মানুষের ক্ষতি হয়েছে, সে কথা সবাই জানলে হয়তো পরিবেশ অনুকূল প্রবাহের ব্যবস্থা করা সহজ হবে?

জনমত তৈরির কাজটা সহজ নয়। বাংলাদেশে তিস্তা ব্যারাজ এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড়ো নদী প্রকল্প। তাকে ঘিরে অনেক আশা আর স্বপ্ন ফিরি করা হয়েছে। কিছু কিছু লোক সেচের সুবিধা কিছুদিন পাওয়ায় সে সুবিধাকে হকের জিনিস বলে মনে হতে শুরু করেছে। অনেকের আশা, ভারত জল ছাড়লে সেই হকের জল পাওয়া যাবে। আবার ভারতেও এরকম কিছু চাষি আছে, যারা সেচের জল আংশিক ভাবে পেয়েছে বা শিগ্‌গির পাবে বলে আশা করে। তারা ব্যারাজের বড়ো সমর্থক, হকের জল বাংলাদেশকে ছাড়তে নারাজ। দুই দেশের দুই ব্যারাজ আর কিছু না করুক, সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রতিবেশী দেশের প্রতি অহেতুক বিরুদ্ধ ভাবের চর্চায় ইন্ধন দিয়েছে। সেটা সামলানো মুশকিল।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s