তিস্তা নদীর জলবন্টন নিয়ে ভারত-বাংলাদেশ সওয়াল জবাব

 

মোঃ খালেকুজ্জামানের সঙ্গে দেবাশিস সেনগুপ্তের ইমেল সংলাপের সারাংশ (২৪৩১ জুলাই ২০১৩)

এক অববাহিকা থেকে অন্য অববাহিকায় জল স্থানান্তর প্রসঙ্গে

খালেক :আপনার প্রবন্ধ পড়ে ও সংযুক্ত ম্যাপ দেখে যেটা বুঝলাম তা হল যে গাজলডোবা থেকে তিস্তা নদীর প্রায় সব পানিই কৃত্রিম খালের মাধ্যমে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে পশ্চিমে মহানন্দা, মেচী, পুনর্ভবা, আত্রাই সহ অন্যান্য নদীর অববাহিকায় যা কিনা আন্তঃনদী সংযোগেরই নামান্তর$ প্রত্যেক নদীর অববাহিকার পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং সুরক্ষা সেই নদীর অববাহিকাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে এটাই কাম্য, ন্যায়সঙ্গত এবং বিজ্ঞানসম্মত$ অববাহিকাভিত্তিক পানি সম্পদের উন্নয়নই সারা দুনিয়ায় প্র্যাকটিস করা হয়ে থাকে$ এক নদীর পানি অন্য নদীর অববাহিকায় সরিয়ে নিয়ে সেচ এবং পানীয় জলের চাহিদা যদি হিসেব করা হয় (যেমনটা আপনার রিপোর্টে করা হয়েছে), তাহলে শুরুতেই শুভঙ্করের ফাঁকি থেকে যায়$ তিস্তার পানি সরিয়ে ফরাক্কার উজানে যদি গঙ্গার পানি প্রবাহ বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাহলে তিস্তার বর্ষাকালীন পানিও পর্যাপ্ত হবে না$

দেবাশিস :এক নদী থেকে অন্য নদীতে জল স্থানান্তর বন্ধ করার মতো কোনো জাতীয় বা আন্তর্জাতিক আইন না থাকলেও একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় এমন স্থানান্তরে সুবিধার থেকে ক্ষতি হয় অনেক বেশি$ তবে তিস্তা প্রকল্পের ক্ষেত্রে আন্তঃনদী স্থানান্তরের পরিমাণ সামান্য$ প্রচুর অর্থব্যয়ে দীর্ঘ খাল খনন করা হয়েছে, কিন্তু সেই খাল দিয়ে এক নদী থেকে অন্য নদীতে জল যায় না বললেই চলে$ শুকনো মরসুমে তো খালের প্রায় পুরো জলটাই তিস্তা অববাহিকায় থেকে যায়$ (শিলিগুড়িতে পানীয় জল কিছু যায়, তবে সে প্রয়োজন নগণ্য, এক কিউমেকের কম$) তবু শুকনো মরসুমে তিস্তার জল সরানো সমর্থনযোগ্য নয়$ তাতে শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারতবর্ষেও ক্ষতি হচ্ছে$ এই সব ক্ষতির কথা দুটি ব্যারাজ একটি নদী প্রবন্ধে জানানো হয়েছে$ আন্তঃনদী সংযোগের বিষয়টি তিস্তার ক্ষেত্রে আপাতত এতই গৌণ যে তা নিয়ে ব্যস্ত হলে আরও বড়ো সমস্যা থেকে নজর সরে যেতে পারে$

খালেক :অন্য অববাহিকায় পানি সরানো নিয়ে আমি বাস্তবিকই উদ্বিগ্ন$ এটা আসলে ভারতের কুখ্যাত নদী সংযুক্তি প্রকল্পের একটা ধাপ$ তিস্তা প্রকল্পের প্রথম স্টেজের প্রথম সাবস্টেজেই ৩ লক্ষ ৪২ হাজার হেক্টর জমি সেচের আওতায় আনার কথা, যা তিস্তা অববাহিকায় পশ্চিমবঙ্গের হিস্যার চেয়ে বেশি$ তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পের ম্যাপ থেকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, সেচ এলাকার বেশিরভাগটাই অন্য নদীর অববাহিকায়$ আপনি হিসেব করে দেখিয়েছেন, প্রকল্পের খালগুলির পানি বহন ক্ষমতা তিস্তার শুকনো মৌসুমের প্রবাহের চেয়ে বেশি$ এটা আরও ভয়ের কথা, কারণ খালগুলি বানানোই হয়েছে শুকনো মৌসুমের পুরো পানিটুকু টেনে নেওয়ার উপযোগী করে$

দেবাশিস :তিস্তা প্রকল্পে জলঢাকা, তিস্তা, মহানন্দা ও ডাউক নদীকে খাল দিয়ে যুক্ত করার কথা আছে, যা নদী সংযুক্তি প্রকল্পের অংশভুক্ত হতে পারে, এ কথা মানতে অসুবিধে নেই$ কিন্তু খাল আছে মানেই সেখান দিয়ে জল যাচ্ছে, একথা ঠিক নয়$ প্রকল্প এলাকার যে ম্যাপ দেখেছেন, সেটা ম্যাপই বাস্তব নয়$ আপনি গুগ্‌ল আর্থএ খালগুলির ছবি বড়ো করে দেখবেন, মহানন্দার পরবর্তী অংশে জলের চিহ্ন মাত্র দেখতে পাবেন না$ খালগুলিতে জল বয় শুধু বর্ষার সময়ে$ তাও খালের বহন ক্ষমতার চার আনাও কাজে লাগানো হয় না$ বর্ষায় তো প্রায় সব জলটাই বাংলাদেশে বয়ে যায়$ বর্তমানে তিস্তার আসল ক্ষতি হচ্ছে শুকনো মরসুমে জল সরানোর ফলে, যদিও সেই স্থানান্তরিত জল মূলত তিস্তা অববাহিকার মধ্যেই (জলপাইগুড়ি জেলায়) থেকে যায়$

আন্তঃনদী জল স্থানান্তর বিপজ্জনক কাজ, কিন্তু তিস্তার ক্ষেত্রে আরও বিপজ্জনক হয়েছে প্রকল্প ঘিরে আকাশছোঁয়া প্রত্যাশার চর্চা$ এটা শুধু ভারতবর্ষে নয়, বাংলাদেশেও হয়েছে$ সেখানে শেষ পর্যন্ত সাড়ে সাত লক্ষ হেক্টর জমিতে সেচের কথা বলা হয়েছে, অথচ অববাহিকার অংশ মাত্র দুই লক্ষ হেক্টরের মতো$ বাকি সব এলাকাই অন্য নদীর অববাহিকায়$ এই বিশাল এলাকায় যারা সেচের জল পাবে আশা করে পায়নি, তাদের ক্ষোভের জন্য দায়ী কি আন্তঃনদী জল স্থানান্তর না মিথ্যা আশার চর্চা?

খালেক :গুগ্‌লএর ছবি তো এক মুহূর্তের চিত্র দেয়, সারা বছরের নয় গত পনেরো বছরের তো নয়ই$ যদি জল না বহন করবে তো খালগুলো বানানো হয়েছিল কেন?

দেবাশিস :চাষিদের সত্যিকারের সুবিধা দেওয়া একটা উপলক্ষ্য; বড়ো নদী প্রকল্প হয় তার নিজস্ব যুক্তিতে$ বড়ো প্রকল্প মানেই বড়ো মাপের টাকা$ অনেক টাকা নড়াচড়া করলে অনেক গুঁড়ো তৈরি হয়$ সেটা কার না ভালো লাগে$

ভারতের একতরফা মনোভাব এবং বাংলাদেশের বঞ্চনা প্রসঙ্গে

খালেক :তিস্তার পানি যেমন খুশি যতদূর খুশি নিয়ে ফেললে তো তিস্তাতে এক ফোঁটা পানিও আর অবশিষ্ট থাকবে না$ তখন বলা হবে যে, যেখানে তিস্তায় মোটেই কোনো পানি নেই সেখানে বাংলাদেশ কিংবা ভাটিতে অবস্থিত কোচবিহারে কীভাবে পানি দেওয়া সম্ভব? আশা করা যাচ্ছে যে ভারতের জনগণ এবং সরকার বাংলাদেশের বিরুদ্ধে এই অন্যায় আচরণ করা থেকে বিরত থাকবে$

দেবাশিস :যথেচ্ছ জল তিস্তা নদী থেকে সরানো হলে সবারই ক্ষতি$ আমার মনে হয় এই আলোচনায় আমরা বাংলাদেশের স্বার্থ ও ভারতবর্ষের স্বার্থের দর কষাকষিতে না ঢুকলেই ভালো$ বরং ভালো করে বুঝে দেখা যাক সাধারণ লোকজনের কীসে স্থায়ী সুবিধা হয়$ আগে দেখা যাক তিস্তার দুটি ব্যারাজ আখেরে সাধারণ মানুষের উপকারে আদৌ আসছে কি না সীমান্তের এপারে হোক বা ওপারে$

খালেক :নিশ্চিত থাকুন, আমি বাংলাদেশের হয়ে ওকালতি করছি না$ আমি শিক্ষাজগতের মানুষ (academician), ঘটনাক্রমে বাংলাদেশি; পানিসম্পদ উন্নয়নে সর্বোত্তম ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি (best management practice) তুলে ধরার চেষ্টা করে থাকি$ অবশ্য বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ আমার লেখায় প্রকট হয়ে থাকতে পারে$ কারণটা স্বাভাবিক ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক ভাবে শক্তিশালী প্রতিবেশী দেশ আন্তর্জাতিক নদীগুলিকে একতরফা নিয়ন্ত্রণ করছে, বাংলাদেশ এই পরিস্থিতির শিকার$ তবে বাংলাদেশের দোয়ানী ব্যারাজের পরিবেশগত দিক নিয়েও আমি প্রশ্ন তুলেছি$

আপনি তো জানেন, তিস্তার সমস্যা ভারতবাংলাদেশ সম্পর্কে উত্তেজনার একটা বড়ো কারণ$ আমাদের যুক্তিনিষ্ঠ হতে হবে; আন্তর্জাতিক নদীগুলির ব্যবস্থাপনায় বিজ্ঞানের দেখানো পথে যেতে হবে$ নীতি নির্ধারণের বেলায় তিস্তা অববাহিকায় বসবাসকারী সকল মানুষের স্বার্থ ও পরিবেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে$ তিস্তার জলের ন্যায্য হিস্যা পাওয়া ভাটির দেশ বাংলাদেশের ইচ্ছাধীন নয়$ ভারতকেই অনুকম্পা (compassion) ও ন্যায়বিচার দেখাতে হবে যৌথ নদীগুলির ব্যাপারে$

দেবাশিস :দয়া করে অনুকম্পার প্রসঙ্গ আনবেন না এই আলোচনায়$ এতে শুধু বিভ্রান্তি তৈরি হয়$ লোকে ভাবে একজন ভাগ ছাড়বে তবে আর একজন পাবে$ ব্যাপারটা সেরকম নয়$ ভারত সরকারকে তিস্তা দিয়ে জল বইতে দিতে হবে ভারতবাসীরই স্বার্থে, আর সেই স্বার্থের সঙ্গে বাংলাদেশবাসীর স্বার্থের বিরোধ নেই$ সকলেরই স্বার্থে নদী অববাহিকার পরিবেশ বাঁচাতে হবে$

খালেক :তিস্তার পানি ছেড়ে ভারতের স্বার্থ রক্ষা হবে বলতে আপনি কী বোঝাচ্ছেন? তাই যদি হবে তো এতদিন পানি ছাড়া হয়নি কেন? আপনি কি বর্ষার পানির কথা বলছেন?

দেবাশিস :গাজলডোবা প্রকল্পের খাল দিয়ে সেচের ব্যবস্থা হবার পর থেকে জলপাইগুড়িতে বর্ষার চাষের এলাকা বাড়েনি, বরং কমেছে$ কিছু চাষি কিছু জল পেয়েছে, তাদের উৎসাহ দেওয়া হয়েছে শুকনো মরসুমের চাষে, যাতে জল অনেক বেশি লাগে$ খালের জলে সেচ কুলোয়নি, মাটির জল ব্যবহার করেছে তারা$ অতিরিক্ত ব্যবহারে মাটির জলস্তর নেমে যাওয়ার প্রাথমিক ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে$ এখন আবার শুকনো মরসুমের সীমিত জল আরও বেশি জমিতে আরও পাতলা করে ছড়িয়ে দেওয়া শুরু হয়েছে, তাতে এই সমস্যা আরও জটিল হবে$

ব্যারাজের ভাটিতে বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষ সেচের জল পায়নি, শুধু নদী শুকিয়ে যাওয়া থেকে বিপদে পড়েছে$ জলবিজ্ঞানের স্বাভাবিক নিয়মে ব্যারাজ থেকে জল নেওয়ার ফলে নদী সবচেয়ে বেশি শুকায় নিকটবর্তী ভাটি অঞ্চলে$ সেই অঞ্চলের মানুষ, যার মধ্যে জলপাইগুড়ি ও হলদিবাড়ি শহরের বাসিন্দারাও আছে, তারা শুকিয়ে যাওয়া নদী, নামতে থাকা জলস্তর ও বিপর্যস্ত পরিবেশের শিকার$

প্রকল্প থেকে জলবিদ্যুৎ পাওয়া গেছে উৎপাদন ক্ষমতার ৬ শতাংশ$ সেচের ব্যাপারেও স্বপ্ন ও বাস্তবের ব্যবধান মোটামুটি এই মাপেই$ এত অল্প সুবিধা থেকে প্রকল্প চালানোর খরচই ওঠে না$ তাছাড়া সুবিধাগুলি সুস্থায়ী নয়, সাময়িক$ অন্যদিকে পরিবেশের ক্ষতি অনেক দীর্ঘস্থায়ী$

তবে প্রকল্পের থেকে সবচেয়ে বড়ো ক্ষতি হয়েছে অপূর্ণ প্রত্যাশার জেরে, বছরের পর বছর যে প্রত্যাশায় ইন্ধন জোগানো হয়েছে (যেমনটা বাংলাদেশেও)$ প্রকৃতিপরিবেশের স্বাভাবিক দানের সীমাটুকু বুঝে নিয়ে তিস্তার থেকে আমাদের প্রত্যাশার মাপ কমাতে না পারলে আমরা পাগলের মতো লুঠপাট করে নদীটাকে ছিবড়ে করতে থাকব$

এই সব দেখে শুনে মনে হয়, শুকনো মরসুমে সমস্ত জলটাই তিস্তা দিয়ে বইয়ে দেওয়া ছাড়া ভারতবাসীর স্বার্থ রক্ষার কোনো যুক্তিসঙ্গত পথ নেই$ বর্ষায় তো গাজলডোবায় খুব একটা জল স্থানান্তর হয় না, সে নিয়ে আলোচনায় যাচ্ছি না$

খালেক :আমার হিসেবে তিস্তা অববাহিকায় বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যার অনুপাত ৬০৪০, আপনার হিসেবে বাংলাদেশের অংশ আরও বেশি$ সেই যুক্তিতে, পরিবেশের জন্য প্রয়োজনীয় প্রবাহের সংস্থান রেখে বাকিটা থেকে বাংলাদেশের অন্তত ৬০ শতাংশ পানি পাওয়া কি ন্যায্য নয়? আমি তো সেই প্রস্তাবই করেছি$

দেবাশিস :আপনি অন্যত্র বলেছেন, পানিবিজ্ঞান পরিবেশবিজ্ঞান ও প্রকৃতির নিয়ম অনুসারে ১০০ শতাংশ জল বাংলাদেশের প্রাপ্য; সে কথা সমর্থনযোগ্য$ আশা করি যে দোয়ানীর ভাটিতে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর জন্যও আপনি একই যুক্তি প্রয়োগ করবেন$ রঙপুরের দক্ষিণে যদি আর একটি দেশের সীমানাথাকত, সেই দেশেরও কি ১০০ শতাংশ জল প্রাপ্য হত না?

আপনার কথার প্যাঁচে আপনাকেই জড়ানোর দুর্বুদ্ধি থেকে একথা বলছি না$ আপনার সর্বশেষ প্রস্তাব নিয়ে আমার অসুবিধে এটুকুই পরিবেশের জন্য বছরের সব সময়ে ৮০ থেকে ১০০ শতাংশ জল ছাড়া জরুরি বলে আমার মনে হয়$ তার ব্যাখ্যা অন্যত্র দিয়েছি$ যদি ৮০ শতাংশ জলও ছাড়া হয়, শুকনো মরসুমে তার পর এত কম জল বাকি থাকে যে ৫০৫০ই বলুন আর ৬০৬০ই বলুন, ভাগাভাগিই অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়$ ওইটুকু জল ভাগ না করে ১০০ শতাংশ জল পাহাড় থেকে সাগর অবধি নদীর সর্বত্র বইতে দিলেই হয়$ বর্ষার চাষে বরং কিছুটা সেচ সম্ভব ব্যারাজ দুটো বানানো যখন হয়েই গেছে$

খালেক :বাংলাদেশের লোকে সাধারণভাবে অনুভব করে, ভারত ন্যায্য ভাবে পানির বন্টন করে না$ বাংলাদেশের দাবি এক ফোঁটাও অন্যায্য নয়, কিন্তু দেওয়া না দেওয়া সবই ভারতের হাতে$ অববাহিকার বাইরে পানি নিয়ে গিয়ে শিলিগুড়ি শহরে পাঠানো, বিদ্যুৎ উৎপাদন কোনো ব্যাপারেই আন্তর্জাতিক রীতিনীতি মেনে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা করে নেওয়ারও প্রয়োজন বোধ করে না সে$ বাংলাদেশে অবিচারের এই ধারণা ভালো লক্ষণ নয়, ভারতকেই উদ্যোগী হতে হবে এই ধারণা দূর করতে$ সংবাদ মাধ্যমের খবর অনুসারে (সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অফ ড্যামস, রিভার অ্যান্ড পিপ্‌ল), ভারত ব্রহ্মপুত্রের বিভিন্ন উপনদীতে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বানানোর উদ্যোগ করছে যাতে প্রথম ব্যবহারকারী হিসেবে ব্রহ্মপুত্রের জল দাবি করা যায় চীন সে জল স্থানান্তর করার আগেই$ প্রশ্ন হল, ভারতেরও আগে তিস্তা প্রকল্প চালু করে বাংলাদেশ কি একই রকম অগ্রাধিকার প্রতিষ্ঠা করে ফেলেনি? সে অধিকার থেকে বাংলাদেশকে বঞ্চিত করা কি ভারতের পক্ষে দ্বিচারিতা নয়?

দেবাশিস :সরকারগুলি দ্বিচারিতা তো করেই থাকে, আমরা তাদের অনুকরণ করতে যাব কেন? পরিবেশ নিয়ে দ্বিচারিতা করলে তবেই অগ্রাধিকারএর প্রশ্ন ওঠে$ শুকনো মরসুমে আমরা যদি পরিবেশ অনুকূল প্রবাহ বজায় রাখতে চাই, তাহলে জল সরানোর প্রশ্ন নেই, ভাগাভাগিরও নয়$

খালেক :আপনার মতামত জেনে ভালো লাগল$ এখন আমার হাতে বেশি সময় নেই, বিস্তারিত পরে জানাব$ আপাতত এটুকু জানাই আপনার সঙ্গে আমার দেখার ভঙ্গি অনেকটাই মিলছে$

দোয়ানী প্রকল্পের সাফল্য বা ব্যর্থতা প্রসঙ্গে

দেবাশিস :আপনার প্রবন্ধে বলা হয়েছে, দোয়ানী (বা ডালিয়া) ব্যারাজের ভাটিতে পরিবেশ, প্রতিবেশ এবং কৃষির ওপর এই প্রকল্পের কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়েছে কিনা তা নিয়ে কোনো গবেষণা হয়নি$ এক্ষেত্রে সন্দেহের অবকাশ পাবে পরিবেশ$ পরিবেশের প্রশ্নে নির্দোষ প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত দোষী ধরতে হবে যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্পকে$ ভারতবর্ষের তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পের নিরীক্ষা থেকে দোষের প্রমাণ পাওয়া গেল বিস্তর$ এবার বাংলাদেশের তিস্তা ব্যারাজ নিয়েও স্বাধীন নিরীক্ষা হোক$

আপনি লিখেছেন, দোয়ানী ব্যারাজ সেচ প্রকল্পের সাফল্য বেশিদিন ধরে সম্ভব হয়নি তার উজানে গাজলডোবা থেকে ভারত জল সরিয়ে নিতে শুরু করায়$ এই ধরনের মন্তব্য থেকে বিরত থাকা ভালো$ ভারতবর্ষের তিস্তা ব্যারাজের নিরীক্ষায় আমরা দেখেছি, ফাঁপিয়ে তোলা প্রত্যাশা আর বাস্তব প্রাপ্তির ফারাক থাকে কত$ প্রাথমিক হিসেবে তো মনে হচ্ছে দোয়ানী প্রকল্পের লক্ষ্যমাত্রাও ফাঁপিয়ে তোলা, বাস্তবের তিস্তা তার জন্য প্রয়োজনীয় জল কোনোদিন জুগিয়ে উঠতে পারবে না$

খালেক :আপনি লিখেছেন, শুকনো মৌসুমে তিস্তার প্রবাহ আসলে যা থাকে তার চেয়ে বেশি অনুমান করা হয়েছিল বলে দোয়ানী প্রকল্প ব্যর্থ হয়ে থাকতে পারে$ আমার প্রবন্ধের একটি তথ্যসূত্র থেকে দেখবেন, ওই সময়ে স্বাভাবিক প্রবাহের ৮৫ শতাংশ গাজলডোবায় নদী থেকে সরিয়ে ফেলা হয়, যার ফলে বাংলাদেশে নদী শুকিয়ে যায়$ বাংলাদেশে শুকনো মৌসুমের প্রবাহ ৯০০০ কিউসেক থেকে কমে ১০০০ কিউসেক হয়ে গেছে, যেখানে পরিবেশ রক্ষার জন্য আনুমানিক ৩২০০ কিউসেক জরুরি$

দেবাশিস :দোয়ানী ব্যারাজের কাছে ডালিয়াতে তিস্তা নদীর প্রবাহ মাপা হয়ে আসছে বহু বছর ধরে বাংলাদেশের স্বাধীনতারও আগে থেকে$ তিস্তার প্রবাহ যখন মুক্ত ছিল, সেই যুগেও জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসের গড় প্রবাহ ছিল ৬২০০ কিউসেকের মতো (প্রায় ১৭৫ কিউমেক)$ (আপনার হিসেব সম্ভবত এপ্রিল মাসের, যখন নদীতে জল আর একটু বেশি থাকে$) এক একটি চাষে কয়েক মাস ধরে যে জলটা লাগে সেই হিসেব করে আপনিই বলুন না, তিস্তার সব জলটা পেলেও শুকনো মরসুমে দোয়ানী প্রকল্প থেকে কতখানি জমিতে সেচ সম্ভব, আর তার মধ্যে কতখানি জমিতে সেচ করার পরামর্শ আপনি দেবেন পরিবেশের কথা মাথায় রেখে$

খালেক :মানছি, সাড়ে সাত লক্ষ হেক্টর সেচের লক্ষ্যমাত্রা রাখা বাড়াবাড়ি হয়েছিল$ তিস্তার স্বাভাবিক প্রবাহের যা হিসেব পাচ্ছি তার সবটুকু ব্যবহার করলেও, আপনার মতো হিসেব করে দেখা যাচ্ছে, বড়ো জোর ২৮ থেকে ৮১ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ করা সম্ভব$ অবশ্য সবটুকু জল সেচের জন্য ব্যবহার করা সম্ভব নয়$ প্রকৃত সেচ সবচেয়ে বেশি হয়েছিল ১৯৯৮ সালে কুড়ি হাজার হেক্টর জমিতে, যা প্রথম পর্যায়ের লক্ষ্যমাত্রার এক ভগ্নাংশ মাত্র$ আপনার হিসেব অনুযায়ী ভারত এর দ্বিগুণেরও বেশি (৪৮ হাজার হেক্টর) জমিতে সেচের ব্যবস্থা করেছে$ জনসংখ্যার হিস্যার হিসেবে অন্তত ৬০ শতাংশ সেচের পানি ব্যবহার হওয়া দরকার ছিল বাংলাদেশে$ অবশ্য এভাবে হিসেব করলে মনে হয়, সেচের পানি সরবরাহ করা ছাড়া নদীর যেন আর কোনো কাজ নাই$ নদী তো পাইপলাইন মাত্র নয়, তেষ্টার পানি জোগানো, মাছকে বাঁচার জায়গা দেওয়া, নৌবহন, পলি বহন করে ভূমি গঠন সব কাজই সে করে$

বিতর্কের সংখ্যাগত ভিত্তি প্রসঙ্গে

খালেক :আপনার তথ্যের সঙ্গে আমার তথ্য মিলছে না$ খাঁটি তথ্য চাই$ সংখ্যার ব্যাপারে এক জায়গায় দাঁড়াতে না পারলে কোনো আলোচনাই চলে না$

দেবাশিস :ঠিক কথা$ তবে দুটি জায়গা ছাড়া আপনার সঙ্গে আমার তথ্যের গরমিল বিশেষ নেই$

তিস্তা অববাহিকায় জনসংখ্যা আপনার চেয়ে আমার হিসেবে অনেকটাই কম শুধু বাংলাদেশে নয়, পশ্চিমবঙ্গেও$ আমি হিসেব করেছি ২০১১ সালে দুই দেশে হওয়া জনগণনা থেকে পাওয়া জেলাভিত্তিক সরকারি তথ্য অনুসারে$ আপনার দেওয়া হিসেব অনুযায়ী, তিস্তা অববাহিকায় বাংলাদেশের অংশে জনবসতির ঘনত্ব দাঁড়ায় প্রতি বর্গ কিলোমিটারে মোটামুটি ৬৫০০, আর পশ্চিমবঙ্গের অংশে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ২৬০০$ গোটা বাংলাদেশে এই মুহূর্তে জনবসতি প্রতি বর্গ কিলোমিটারে হাজারের কিছু বেশি হবে, তিস্তা অববাহিকায় তার কয়েক গুণ বেশি হওয়া স্বাভাবিক লাগছে না$

গরমিলের আর একটি ক্ষেত্র হল, পরিবেশ অনুকূল প্রবাহ$ এই ব্যাপারে নানা মুনির নানা মত হতে পারে, তাই একটি হিসেবের ওপর ভরসা না করাই যুক্তিযুক্ত$ অনেকগুলি সমীক্ষার ফল একত্র করে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অফ দি এনভায়রনমেন্ট বা আইইউসিএন একটি রিপোর্ট বের করেছে (Dyson, M., Bergkemp, G. And Scanlon, J., eds., 2003: The Essentials of Environmental Flows, Water and Nature Initiative, International Union for Conservation of Nature and Natural Resources, http://moderncms.echosystemmarketplace.com/repository/moderncoms_documents/iucn_the-essentials-of-environmental-flows.pdf) তাতে বলা হয়েছে, পলি সংবহন, জীববৈচিত্র্য ধারণ, মাটির জলস্তরের সাম্য ইত্যাদি পরিবেশের বিভিন্ন দিক রক্ষা করতে বছরের যে কোনো সময়ে একটি নদীর স্বাভাবিক গড় প্রবাহের ৬৫ থেকে ৯৫ শতাংশ বজায় রাখার প্রয়োজন$ বিষয়টি জটিল, আমাদের জ্ঞান সীমিত, সাবধানে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ$ তাই প্রবাহমাত্রা সারাক্ষণ ৯৫ শতাংশের বেশি রাখতে পারলে ভালো, ৮০ শতাংশের নিচে নামতে দেওয়া অহেতুক ঝুঁকির কাজ হবে$ তিস্তা অববাহিকার প্রবাহ আমরা তৈরি করিনি$ প্রকৃতি কেমন করে তা ধারণ করে চলেছে আমরা ঠিক বুঝি না$ বন্দুক হাতে শিশুর মতো প্রকল্পওয়ালারা সব লণ্ডভণ্ড করে চলেছেন$ এরকম হতে দিলে বড্ড বেশি ঝুঁকি নেওয়া হয়ে যায়, শুধু আমাদের জন্য না, আমাদের সন্তান সন্ততিদের জন্য$

দেবাশিস সেনগুপ্তের প্রবন্ধের সূত্রে মোঃ নুরুল ইসলাম ও ডঃ কিউ আর ইসলামের সংযোজন

দুটি ব্যারাজ একটি নদী একটি তথ্যবহুল প্রবন্ধ$ প্রবন্ধটিতে ভারতের অংশের তথ্য সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে$ এর সাথে বাংলাদেশ অংশের নিম্নে বর্ণিত তথ্য যোগ করা হলে প্রবন্ধটি আরও তথ্যবহুল হবে বলে আমাদের বিশ্বাস$

বাংলাদেশে তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্প দুই পর্যায়ে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা নিয়ে প্রায় সাড়ে ৭ লক্ষ হেক্টর জমিতে সেচ, বন্যা থেকে রক্ষা ও নিষ্কাশন সুবিধা দেওয়ার লক্ষ্যে শুরু করা হয়$ শুধুমাত্র সেচ সুবিধা দেয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় সাড়ে ৫ লক্ষ হেক্টর$ মূল ভৌত অবকাঠামোসমূহের মধ্যে প্রায় ১৩ হাজার কিউমেক পানি নির্গমন ক্ষমতা সম্পন্ন ৬ শত মিটারের বেশি দৈর্ঘ্যের ব্যারাজ ও প্রায় ৩ শত কিউমেক পানি নির্গমন ক্ষমতা সম্পন্ন ১ শত মিটারের কিছু বেশি দৈর্ঘ্যের হেড রেগুলেটর$ এছাড়া সেচ নালা নেটওয়র্ক, নিষ্কাশন খাল ও বন্যা বাঁধ নির্মাণ অন্তর্ভুক্ত ছিল$ লালমনিরহাট জেলার ডালিয়াতে তিস্তা নদীর ওপর ব্যারাজ তৈরি সম্পন্ন হয় ১৯৯০ সালে$ সীমিত সেচ পানি সরবরাহ অবকাঠামো নিয়ে এই ব্যারেজ ১৯৯৩ সালে চালু করা হয়$ এরপর ১৯৯৮ সালে প্রথম পর্যায়ের কাজ সম্পন্ন হয়$ এই পর্বে ৩ শত কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের মূল নালা, প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের দ্বিতীয় শাখা বা সেকেন্ডারি নালা ও ২ হাজার ৭ শত কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের তৃতীয় শাখা বা টার্শিয়ারি নালা এবং ৮ হাজার সেচ পানি নির্গমন মুখ বা আউটলেট তৈরি করা হয়$ যাতে করে ১ লক্ষ ১১ হাজার হেক্টর জমিতে বর্ষা মরসুমে সর্বোচ্চ ২০ হাজার হেক্টর এবং বর্ষাপূর্ব মরশুমেও একই পরিমাণ জমি নির্ধারণ করা হয়$ ওই বছর বাংলাদেশের তিস্তা নদীর সর্বোচ্চ পানি প্রবাহ ছিল ২০৩ ঘনমিটার/সেকেন্ড$ সর্বনিম্ন ৯০ ঘনমিটার/সেকেন্ড$ সর্বোচ্চ, সর্বনিম্ন ও গড় প্রবাহ থেকে সেচ পানি চাহিদার যথাক্রমে শতকরা ৮০, ৩৫ এবং ৫৮ ভাগ পূরণ করার জন্য যথেষ্ট ছিল$ পরের বছর সর্বোচ্চ প্রবাহ থেকে সেচ পানি চাহিদার শতকরা ৩২ ভাগ পূরণ সম্ভব হয়$ পরবর্তী চার বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রবাহ ছিল ২০০০ সালে$ ওই বছর সর্বোচ্চ, সর্বনিম্ন ও গড় প্রবাহ ১৯৯৮ সালের তুলনায় যথাক্রমে শতকরা ২০, ৮১ ও ৩৯ ভাগ বেশি ছিল$ তবে ২০০২ সালে ১৯৯৮ সালের তুলনায় সবরকম প্রবাহ একচতুর্থাংশ হ্রাস পায়$ সর্বোচ্চ প্রবাহ সেচ পানি চাহিদার শতকরা ৬০ ভাগ পূরণ করার জন্য যথেষ্ট ছিল$ যা হোক, তিস্তা নদীর পানি ব্যবহার করে ২০০১ সাল পর্যন্ত সেচ লক্ষ্যমাত্রার অর্জিত পরিমাণ ছিল বর্ষা মৌসুমে সর্বোচ্চ শতকরা ৮০ ও সর্বনিম্ন ২১ ভাগ এবং বর্ষাপূর্ব মৌসুমে সর্বোচ্চ শতকরা ১০০ এবং সর্বনিম্ন শতকরা ৩৪ ভাগ$ মাঠ পর্যায়ে ২০০৩ সালে এক সমীক্ষাকালে তিস্তা ব্যারাজ থেকে ৬ কিলোমিটার ভাটায় নিলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলাধীন খালিশা চাপানি গ্রামের কৃষকেরা তিস্তার পানি ব্যবহারে সেচ খরচ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে বলে জানায়$ তাদের মতে নদীর পানি সেচে খরচের পরিমাণ ভূগর্ভস্থ পানি সেচে খরচের পাঁচ ভাগের এক ভাগ$ আট কিলোমিটার ভাটায় ঝুনাগাছ চাপাই ইউনিয়নের কৃষকেরা ১৯৯৮ সালের বর্ষা মৌসুমে সেচ দিয়ে প্রায় ১৬ শত হেক্টর জমি চাষ করতে পারে$ পরবর্তী কয়েক বছর তুলনামূলক ভাবে বৃদ্ধি পেলেও ২০০০ সালে হ্রাস পায়$ তবে বর্ষাপূর্ব মৌসুমে সেচাধীন জমি ১৯৯৯ সালে ১১ শত হেক্টর থেকে শুরু করে ২০০২ সাল পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়ে ২০০৩ সালে হ্রাস পায়$ দশ কিলোমিটার ভাটায় নাওতারা গ্রামে সেচ পানি ব্যবহার করে বছরে দুই ফসল আবাদ শুরু করে$ এতে শ্রমিক চাহিদা বৃদ্ধি পায়, সেই সাথে মজুরিও$ জলঢাকা উপজেলাধীন বড়োঘাট চ্যাংমারী গ্রামটি ব্যারাজ থেকে ২৫ কিলোমিটার ভাটায় অবস্থিত$ এই গ্রামে তিস্তা নদীর পানি দিয়ে সেচ শুরু হয় ২০০০ সালের দিকে$ এই সুবিধা পাওয়ার ফলে সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীলতা কমে আসে$ গ্রামে অগভীর নলকূপের সংখ্যা ৫ শত থেকে কমে ১ শতের কাছাকাছি চলে আসে$ নদীর পানি দিয়ে সেচ দেওয়ার ফলে বর্ষা মৌসুমে আবাদী আমন ধানের ফলন শতকরা ৫০ ভাগ এবং শুষ্ক মৌসুমে আবাদি বোরো ধানের ফলন শতকরা ৩০ ভাগ বৃদ্ধি পায়$ সেচের জন্য পানি পাওয়ায় উচ্চ ফলনশীল নতুন জাতের ধানের আবাদ বৃদ্ধি পায়$ এই সুযোগ পেয়ে অন্যান্য কৃষকেরা আরও সেচ নালা নির্মাণের দাবি করে$ ব্যারাজ থেকে ৫০ কিলোমিটার ভাটায় সুবর্ণখালি গ্রামে সেচের জন্য তিস্তা নদীর পানি শুধুমাত্র শুষ্ক মৌসুমে পাওয়া যায় বলে জানা যায়$ তবে পানি পেতে দেরি হয় এবং অনিশ্চিত$ এই গ্রামের কৃষকেরা সংগঠিত হয়ে পানি ব্যবহারকারী গ্রুপ তৈরি করে তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্প থেকে সেচ সুবিধা আদায়ের জন্য$ তাদের মতে নদীর পানি পেলে ফসল উৎপাদন খরচ কমে এবং ফলনও বেশি পাওয়া যায়$ ডিমলা উপজেলা কৃষি কার্যালয়ে যোগাযোগ করে জানা যায় যে আমন ধানের জমিতে সাম্প্রতিক কালে খরার প্রকোপ বেশি হওয়ায় এবং বৃষ্টিকাল আগের তুলনায় আগাম শেষ হওয়ায় সেচ চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে$ এই এলাকার মাটির নিচের স্তর বালুময় হওয়ায় জমি থেকে পানি নিঃসরণ দ্রুত হয়$ বৃষ্টিপাত কম বা না হওয়ায় বা বর্ষাকাল আগাম শেষ হওয়ায় আমন ধানে ফুল আসার সময় জমিতে খরার প্রকোপ হয়$ এতে ফলন মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়$

যা হোক, উভয় দেশেই অর্থনৈতিক ও সামাজিক দিক থেকে তিস্তা নদীর গুরুত্ব অপরিসীম$ ভারতে নির্মিত তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পের উদ্দেশ্য মূলত দুটি$ প্রথমত নয় লক্ষ হেক্টর জমিতে সেচ পানি সরবরাহ$ দ্বিতীয়ত জলবিদ্যুৎ উৎপাদন$ অধিকন্তু তিস্তা নদীর পানি মহানন্দা নদীতে স্থানান্তরকরণ$ আর বাংলাদেশে নির্মিত তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পের উদ্দেশ্য মূলত একটি$ সাড়ে পাঁচ লক্ষ হেক্টর জমিতে সেচ পানি সরবরাহ করে দেশের বৃহত্তর এক জনগোষ্ঠীর জন্য খাদ্য উৎপাদন ও কর্মসংস্থান$ সেই সাথে আছে পরিবেশে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ও ভূগর্ভস্থ পানির আধার পূনর্ভরণের বিষয়$ যাহোক, উভয় দেশেই সেচ লক্ষ্যমাত্রা এখনও পর্যন্ত অর্জিত হয়নি$ বিশেষ করে তিস্তা নদীর উজান ভারতে$ আর বাংলাদেশে প্রথম পর্যায়ে লক্ষ্যমাত্রা যা মোট লক্ষ্যমাত্রার পাঁচ ভাগের এক ভাগ তাও অর্জন করা সম্ভব হয়নি$ এই অবস্থায় তিস্তা নদীর পানির হিস্যা কোন দেশ কত পাবে এই হিসাব মেলানো মনে হয় বেশ জটিলতর হবে$ তবে এ প্রসঙ্গে গত ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১১ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেনেট ভবনে এক কনফারেন্সে বাংলাদেশে ভূতপূর্ব ভারতীয় হাই কমিশনার বীনা সিকরির তিস্তা নদীর পানি বন্টন চুক্তির জন্য জলতত্ত্ব বিশ্লেষণের পরামর্শ প্রদানের বিষয়টি উল্লেখযোগ্য$ তাছাড়া ভারতের দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলে পানি সরবরাহের জন্য তিস্তা সহ ৩০টি প্রধান নদীর সংযোগ পরিকল্পনা মনে হয় এখনও উদ্বেগের বিষয়$ তবে উভয় দেশের পানি বিষয়ক সমস্যার স্থায়ী সমাধানের উদ্দেশ্যে নদীভিত্তিক পানি বন্টন ব্যবস্থার বদলে অভিন্ন নদীগুলি নিয়ে গঙ্গাব্রহ্মপুত্রমেঘনা নদীর অববাহিকার প্রতিবেশী দেশগুলিকে সঙ্গে নিয়ে আঞ্চলিক যৌথ সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা দরকার$ আর এক্ষেত্রে নেপাল, ভুটান, মায়ানমার ও চীনকেও নেওয়া প্রয়োজন$

দেবাশিস সেনগুপ্তের জবাব

বাংলাদেশের তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্প সম্বন্ধে বিস্তারিত তথ্য জানানোর জন্য ধন্যবাদ জানাই$ বেশ কয়েক গ্রামে চাষ ও সেচের চিত্র পাওয়া গেল সেখানকার মানুষজনের কথা থেকে$ এটা বাড়তি প্রাপ্তি$

আপনি লিখেছেন, প্রথম পর্যায়ে লক্ষ্য ছিল এমন ব্যবস্থা করা যাতে ১ লক্ষ ১১ হাজার হেক্টর জমিতে বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত সেচ দেয়া যায়$ সেই কাজ সমাপ্তির পর বর্ষাপূর্ব (সম্ভবত বোরো) মৌসুমেও সেচের ব্যবস্থা করা হয়$ সেচের চাহিদা ও চাহিদা পূরণের যে তথ্য দিয়েছেন, তাতে বছরের কোন সময়ের কথা বলা হচ্ছে তা স্পষ্ট নয়$ তবে আপনার পাঠানো প্রবন্ধটির সঙ্গে মিলিয়ে দেখছি আপনি এপ্রিল মাসের ১ তারিখ থেকে ২০ তারিখের কথা বলছেন$ এটা কি আমি ঠিক বুঝেছি? বর্ষাপূর্ব মৌসুমে চাষ কি প্রাথমিক পরিকল্পনাতে ছিল?

বর্ষার মৌসুমে বৃষ্টির ফাঁকে ফাঁকে শুকনো দিনগুলিতে অতিরিক্ত সেচের প্রয়োজন মেটানো যতখানি জমিতে সম্ভব, বর্ষাপূর্ব মৌসুমে তা এমনিতেই সম্ভব নয় নদীতে জল কম থাকে বলে$ দোয়ানি ব্যারাজ থেকে ১ লক্ষ ১১ হাজার হেক্টর জমিতে বর্ষাপূর্ব মরশুমে সেচ কোন দিন করা হবে, এটা অবাস্তব আশা$ তার জন্য আমাদের হিসাব অনুযায়ী (যে হিসাব ভারতের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে) ২৭০ কিউমেকের মতো জল লাগবে$ তিস্তায় কোনো ব্যারাজ হওয়ার আগেও বছরের ওই সময় এত জল ছিল না$ সাড়ে সাত লক্ষ হেক্টর জমিতে সেচ করার তো প্রশ্নই ওঠে না তার জন্য যে জল লাগবে তা বর্ষাকালেও অধিকাংশ সময় থাকে না নদীতে$

ভারতবর্ষের যে কোনো সেচ প্রকল্পে আগে মূল খালগুলি তৈরি হয়, তার পর শাখা প্রশাখা$ আপনার লেখা থেকে মনে হচ্ছে, বাংলাদেশেও এরকমই হয়$ সেচের সুবিধা প্রাথমিকভাবে অল্প কিছু জমিতে পৌঁছালে, আশপাশের জমিতে সেচের বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়$ স্থানীয় স্তরে সেচের চাহিদাই বড়ো কথা, সেখানে নদীতে জল কত রয়েছে বা কত জল নিলে পরিবেশের ক্ষতি হবে না অতশত ভাবার অবকাশ নেই$ বর্ষায় ও বর্ষাপূর্ব মৌসুমে তো একই খালব্যবস্থা দিয়ে সেচ হয়$ বর্ষাপূর্ব মৌসুমে যেখানে খাল রয়েছে অথচ সেচ পৌঁছাচ্ছে না, সেখানে একটা বঞ্চনার অনুভূতি হওয়া স্বাভাবিক$ ভারতবর্ষেও এমনটাই হয়েছে$ অল্প অল্প সেচের সুবিধায় কিছু চাষি অভ্যস্ত হয়ে গেলে, সেই সঙ্গে আরও কেউ কেউ সুবিধা পাওয়ার আশা করতে থাকলে উল্টো কোনো ব্যবস্থাই তারা মানবে না, ভাববে বঞ্চনা করা হচ্ছে$ অবাস্তব স্বপ্নের থেকে তৈরি হয় অবাস্তব চাহিদা, আর সেই সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা$

আপনি পরিবেশে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ও ভূগর্ভস্থ পানি আধার পুনর্ভরণের কথা উল্লেখ করেছেন$ এটা খুবই ভালো কথা$ নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন, আমাদের প্রবন্ধেও এই বিষয়গুলিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে$ পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন নদীর ওপর করা সমীক্ষার উল্লেখ করে আইইউসিএনএর একটি সমীক্ষা বলছে, বছরের যে কোনো সময়ে স্বাভাবিক প্রবাহের ৬৫% থেকে ৯৫% লাগে পরিবেশের এক একটি চাহিদা পূরণ করতে$ আমরা যখন তিস্তার পরিবেশ সম্বন্ধে এত বিস্তারিত নিরীক্ষা করিনি, নদীতে এর চেয়ে কম জল রাখা হঠকারী কাজ হবে যাতে অপূরণীয় ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা$ এই যুক্তি মানলে নদীতে এতটাই জল রাখতে হয় যে বাকিটুকু নিয়ে বর্ষার সময়ে সামান্য এলাকায় ছাড়া সেচ করা যায় না$ তিস্তা নদী অববাহিকার পরিবেশ রক্ষা করবে, যা আমরা নিজেদের ক্ষমতায় করতে পারি না$ এই কাজটাও সে করতে পারবে না যদি অবাস্তব দাবি নিয়ে নদীর জল টানাটানি করা হয়$ সেই দাবিগুলিকে কাটছাঁট করা ছাড়া সুস্থায়ী কোনো রাস্তা দেখা যাচ্ছে না$

পরিবেশকে কেন্দ্রে না রেখে জল ভাগাভাগি করতে গেলে আখেরে ঠকব আমরা সবাই$ নেপাল, ভুটান, মায়ানমার বা চীন আমাদের বাঁচাতে পারবে না$

মোঃ নুরুল ইসলামের জবাব

আপনার সুচিন্তিত মতামতের জন্য ধন্যবাদ$ আপনার অবগতির জন্য জানাচ্ছি যে, বোরো ধান আবাদকালকে মূলত বর্ষা পূর্ব মৌসুম বোঝানো হয়েছে$ তিস্তা ব্যারাজ এলাকায় আমন ধানের সাথে সাথে বোরো ধান আবাদ বৃদ্ধি পেয়েছে$ ফলে দুই ফসলি (একই জমিতে বছরে দুই ফসল) জমির পরিমাণ বাড়ছে$ তবে বোরো ধান আবাদে সেচ বাবদ খরচ আমন ধানের তুলনায় শতকরা ৭০ থেকে ২০০ ভাগ বেশি$ কিছু জমিতে আমন ও বোরো ধানের মধ্যবর্তী সময়ে সরিষা বা আলু উৎপাদন হওয়ায় তিন ফসলি আবাদি এলাকাও বেড়েছে$ বোরো মৌসুমে পুরো আবাদি এলাকায় নতুন উচ্চ ফলনশীল (উফশী) জাতের আবাদ হয়$ অন্যদিকে আমন মৌসুমে এখনও কিছু জমিতে দেশি জাতের চাষ হয়$ উফশী জাতের সাথে সাথে বছরে দুই থেকে তিন ফসল উৎপাদনের সুযোগ হওয়ায় কর্মসংস্থান ও খাদ্য সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়েছে$

উল্লেখ্য, তিস্তা ব্যারাজ এলাকা সহ রঙপুর অঞ্চলে বোরো ধান অন্যান্য এলাকার তুলনায় কিছুটা দেরিতে রোপন করা হয়$ জানুয়ারি মাসের শেষ এমনকী ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতেও$ এতে সুবিধা হল, এপ্রিল ও মে মাসে বৃষ্টির পানি পাওয়ায় সেচের ওপর নির্ভরশীলতা কমে আসে$

আঞ্চলিক পানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার ব্যাপারে আমাদের বক্তব্য হল, যে সকল নদী বা নদী সমূহ একের অধিক দেশের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয় সে সকল নদী বা নদী সমূহের পানির সুষ্ঠু ব্যবহারের জন্য আঞ্চলিক সহযোগিতা অপরিহার্য$ তাই উভয় দেশের পানি বিষয়ক সমস্যার স্থায়ী সমাধানের উদ্দেশ্যে নদীভিত্তিক পানি বন্টন ব্যবস্থার বদলে অভিন্ন নদীগুলি নিয়ে গঙ্গাব্রহ্মপুত্রমেঘনা নদীর অববাহিকার প্রতিবেশী দেশগুলির সাথে আঞ্চলিক যৌথ সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা একান্ত প্রয়োজন$

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s