বিপর্যয়ের একমাস পর কেমন আছে কেদারঘাটির মানুষ

শ্রীমান চক্রবর্তী ও শমীক সরকার

 লাপতা

$ হৃষিকেশের মূল বাসস্টপ লাপতা পোস্টারে ছয়লাপ দেখে চমকে উঠলাম$ কেদারনাথের বিপর্যয়ের যে কথা এতদিন খবরের কাগজে বা টিভিতে জেনেছি, তার সাক্ষাৎ পরিচয় আমাদের হল এইভাবেই$ রঙিন, সাদাকালো, জেরক্স, হাতে লেখা হরেক রকম পোস্টার, বিভিন্ন বয়ান, কোনোটাতে ফ্যামিলি ফোটোগ্রাফ তো আবার কোনোটা কেবল পাসপোর্ট ছবি$ মূল বক্তব্য একটাই কেদারনাথের বিপর্যয়ে হারিয়ে গেছে ছবির মানুষটি, নাম এই, বয়স এই$ সন্ধান চাই$ কোথাও কোথাও সন্ধান দেওয়ার ইনামও লেখা আছে$ এক লক্ষ টাকা অবধি ইনাম তো হামেশাই চোখে পড়ল$ একটা বিজ্ঞাপনও দেখলাম, স্থানীয় একটি ফোটোগ্রাফির দোকানের$ তারা বিনা পয়সায় (ফ্রিতে) কেদারে নিখোঁজ যাত্রীদের সন্ধান চেয়ে পোস্টার বানিয়ে দেবে$ আমাদের যাত্রাসঙ্গী, ছাত্র আন্দোলনের কর্মী কাটোদরের কুমায়ুনি যুবক পঙ্কজ বাওয়ারি বলল, এগুলোর ছবি তুলে রাখো!

$ বাসের জানলা থেকে জঙ্গলের রাস্তার পাশে চরে বেড়ানো কতকগুলো ষাঁড়কে দেখিয়ে পঙ্কজ বলল, ওই বলদগুলোর কোনো মালিক নেই$ উত্তরাখণ্ডে বিজেপি সরকারের আমলে গোহত্যা নিষিদ্ধ হয়েছে$ এখনকার কংগ্রেস সরকার এসে তা বহাল রেখেছে$ ফলে বলদ বেচাকেনা করা যায় না আগের মতো$ কিন্তু বলদ পোষার মতো ক্ষমতা যাদের নেই, তারা কী করবে? তারা বলদগুলোকে বাড়ি থেকে প্রচুর দূরে এনে ছেড়ে দেয়$ যদি বলদ কাউকে দিতে হয়, তাহলে বলদের সঙ্গে তাকে কয়েক হাজার টাকাও দিতে হয়$

$ হৃষিকেশ থেকে ওপরে ওঠার পথে তিনধারার ধাবা এলাকায় পরিচিত ব্যস্ততা নেই$ খাবারও বেশ ভালো, যা অভাবিত$ এর রেশ পেরিয়ে একটু ঝিমিয়ে নিয়ে চোখ মেলতেই দেখলাম, একজায়গায় বিশাল ধস সবুজ পাহাড়ের গায়ে$ আর তার অনতিদূরে দুটি বিশালাকার মোবাইল টাওয়ার$ যাওয়ার পথে দুএকটা বাস আর দুএকটা জিপ কেবল চোখে পড়ল$ পর্যটকের লাগেজ মাথায় চাপিয়ে পাহাড় কাঁপিয়ে চলা টাটাসুমো, বোলেরো, মাহিন্দ্রা প্রভৃতি গাড়িগুলো যেন উধাও$ এই রাস্তায় আগের বছরগুলোতেও বেশ কয়েকবার এসেছি$ কিন্তু এমনটা কোনোদিন দেখিনি$

$ কখনো দেখিনি গঙ্গার এই রূপও$ গঙ্গা বলতে দেবপ্রয়াগের আগে গঙ্গাই বটে$ তার পরে, মন্দাকিনিঅলকানন্দার মিলিত ধারা (যা দেবপ্রয়াগে গিয়ে উত্তরকাশীর দিক থেকে আসা ভাগীরথির সঙ্গে মিশে গঙ্গা হয়েছে) গঙ্গা যেন উপচে পড়ছে$ আর কী ঘোলা জল$ দেবপ্রয়াগ পেরিয়ে রুদ্রপ্রয়াগের দিকে যত চলেছি, বিপর্যয়ের আভাস মিলতে শুরু করল$ রাস্তার ধার দিয়ে দিয়ে কিছু মন্দির/বাড়ি ভাঙা$ শ্রীনগর একটি বড়ো শহর$ তার কাছাকাছি এসে দেখলাম, পিচঢালা রাস্তার ধার দিয়ে পাড় ভেঙেছে$ আর রাস্তার যেদিকে গঙ্গা, তার উল্টোদিকের বাড়িগুলিতে শুকনো কাদাভর্তি$ বোঝা গেল, গঙ্গা রাস্তা টপকে চলে এসেছিল অপরদিকের বাড়িগুলির মধ্যেও$ শ্রীনগরের চকটি সবসময় লোকে লোকারণ্য থাকে$ জিপ, ভাড়ার গাড়ি আর বাসে ছয়লাপ থাকে$ আজ দেখলাম, শুনশান$ রুদ্রপ্রয়াগ যাওয়ার লোক পাওয়া যাচ্ছিল না$ আমাদের বাসটা, রুদ্রপ্রয়াগ অবধি যাবে, অনেকক্ষণ দাঁড়ালো শ্রীনগরে$ শ্রীনগর থেকে রুদ্রপ্রয়াগের মাঝে অন্তত দুটো জায়গায় দেখলাম, মন্দাকিনিঅলকানন্দার মিলিত ধারার ওপর কাঠের পুল ভেঙে পড়েছে$ রুদ্রপ্রয়াগে বদ্রীনাথ থেকে এসেছে অলকানন্দা, আর কেদারনাথ থেকে এসেছে মন্দাকিনি$ অলকানন্দার দিকে যে ব্রিজটা, এখন দেখা যাচ্ছে নদী থেকে বেশ কয়েক মিটার ওপরে, ১৬১৭ জুন নদী ওই ব্রিজটাকে ছাপিয়ে গিয়েছিল$ বাসের সহযাত্রীরা একথা জানাল$

figure-plates

$ রুদ্রপ্রয়াগ থেকে জিপে অগ্যস্তমুনি যাওয়া ঠিক হল$ অগস্ত্যমুনি শহরের থেকে খানিকটা ট্রেক করে গেলেই তারপর গুপ্তকাশির গাড়ি পাওয়া যাবে$ রুদ্রপ্রয়াগ থেকে অগস্ত্যমুনির দিকে যাওয়ার রাস্তা মন্দাকিনির গা দিয়ে$ এই রাস্তা দিয়ে চলতে চলতেই বুঝলাম, এতক্ষণ আমরা বিপর্যয়ের যে চিহ্নগুলো দেখেছি, এখানে তা অনেক বেশি$ পিচ রাস্তা ভেঙে ঢুকে গেছে মন্দাকিনিতে$ অগ্যস্তমুনি ঢোকার কিছু আগে গোটা পিচ রাস্তাটাই উধাও, ধসে গেছে গঙ্গার বুকে$ বদলে গঙ্গার তল বরাবর একটি মেকশিফ্‌টরাস্তা তৈরি হয়েছে জেসিবি দিয়ে ধস সরিয়ে$ সেই নিচু রাস্তার এমাথা ওমাথা দেখা যায় না$ দুদিকে দুটি পুলিশ দাঁড়িয়ে বাঁশি বাজিয়ে গাড়ি বা পথচারী পারাপার করছে$ এই পথেই ফেরার সময় আশ্চর্য হয়ে দেখেছিলাম, পুলিশ দুটি নেই$ আমাদের গাড়ি মাঝরাস্তায় আরেকটি মালবাহী গাড়ির সম্মুখীন হয়েছিল$ ওই মালবাহী গাড়িটিকে পিছিয়ে যেতে হয়েছিল পুরো রাস্তাটা, আমাদের গাড়িটার পথ করে দেওয়ার জন্য$

ধ্বংস চিত্র

$ অগস্ত্যমুনিতে গাড়ি থেকে নেমে পায়ে হেঁটে যেতে হবে খানিকটা$ তারপর ভেঙে যাওয়া বিরাট ব্রিজের ওপর দিয়ে সাবধানে পেরোতে হবে মন্দাকিনি$ ওই পায়ে হাঁটা রাস্তায় পড়ন্ত বিকেলের আলোয় যা দেখলাম, তাতে আমাদের চোখ ছানাবড়া! পিচরাস্তা এবং তার পাশের একটা গোটা বাজার উধাও হয়ে গেছে$ বাজারটার কয়েকটি দোকান ঝুলে আছে, আক্ষরিক অর্থে$ যে পরিমাণ ধস এখানে নেমেছে, তার উচ্চতা ৩০০ ফুটের কম হবে বলে মনে হল না$ এক জায়গায় পাহাড়ের গা দিয়ে একটি ঝরনা এসে মিশেছে গঙ্গা (মন্দাকিনি) বক্ষে$ সেই সঙ্গমকে ডিঙিয়ে তৈরি হয়েছে পায়ে চলার পথ$ নয়া রাস্তা$ সেই রাস্তা দিয়ে নদীর ওপাশের গ্রামগুলি, বিজয়নগর প্রভৃতির স্কুল পড়ুয়া থেকে শুরু করে মহিলারা, সবাই অগস্ত্যমুনিতে যাওয়া আসা করছে$ অগস্ত্যমুনিই একমাত্র কাছেপিঠের গঞ্জশহর এখানে$ বড়ো বাজার$ অতএব দরকারি জিনিসের জন্য এখানে আসতেই হবে$ আর সেই পায়ে হাঁটা পথটার একদিকে ফুঁসতে থাকা গঙ্গা, আর একদিকে ২০০৩০০ ফুট খাড়া ধস$ কোথাও কোথাও সেই ধসের গায়ে লটকানো দোকানের ভগ্নাংশ কংক্রিটের চাঁই বিপজ্জনকভাবে ঝুলে আছে নিচ দিয়ে চলা পথচারীর মাথার ওপর$ ফেরার সময় এখান দিয়ে আমাদের সামনেই ধস নেমেছিল$ মাঝেমাঝে বৃষ্টি হচ্ছিল তখন$ মাঝরাস্তায় সেই ধস সামনে দেখে মানুষ পড়িমরি করে পালাচ্ছিল$ আমরাও পালিয়ে ফিরে এসেছিলাম$ তারপর প্রায় প্রাণ হাতে করে ওখানকার অধিবাসীদের মতোই খুব দ্রুত ওই পায়ে চলার পথটি পেরিয়েছিলাম$ দ্রুত যাওয়াও মুশকিল ওখান দিয়ে$ কারণ, পাশের পাহাড় থেকে ঝরনার তীব্র ধারা এসে মিশছে এখানে গঙ্গার সঙ্গে$ সন্ধ্যের পরেও এখানে লোক চলাচল হয়, হবে$ আমরা সমতলের মানুষ$ আমাদের ধারণার বাইরে এখানকার মানুষের নিত্য যাতায়াত$ যাই হোক, সন্ধ্যে নেমে আসছিল, তাই টানা পায়ে ভাঙা ব্রিজ পেরিয়ে বিজয়নগর গঞ্জটির মাঝ দিয়ে ট্রেক করে উঠতে লাগলাম ওপরের দিকে গুপ্তকাশী যাওয়ার জিপের খোঁজে$ যাওয়ার পথে দেখলাম, বিজয়নগরে গঙ্গার থেকে অন্তত ৩০০৪০০ ফুট উঁচুতে যে বাড়িগুলো আছে, সেগুলোর ছাদের ওপরে কাদাভর্তি$ মানে এগুলোর মাথায় উঠে গেছিল গঙ্গার জল! শুনলাম, দিনের বেলায় অগস্ত্যমুনির বাজারটি ধসে পড়ে$ তাই মানুষ মারা যায়নি এখানে$

$ ২৬ জুলাই সন্ধ্যায় যখন আমরা গুপ্তকাশীর উদ্দেশ্যে হেঁটে চলেছি আর গাড়ির খোঁজ করে চলেছি, হঠাৎ একটা ডিনামাইট ফাটানোর আওয়াজ শুনলাম$ অগ্যস্তমুনি থেকে ব্রিজ পার হয়ে আসার সময় আমরা দেখছিলাম, বড়ো পাহাড়ের ধস কাটানোর চেষ্টা চলছে$ অগ্যস্তমুনি থেকে আমাদের সাথী জি এস নোটিয়াল হাঁটতে হাঁটতে অনেক কথা বলছিলেন$ তিনি নিজেকে কেদারনাথ মন্দিরের সরকারি রক্ষীবাহিনীর একজন বলে দাবি করলেন$ ১৭ জুন থেকে তিনি উদ্ধারকার্যে লেগেছেন$ নিজের প্রাণ হাতে করে অনেক তীর্থযাত্রীকে বাঁচিয়েছেন$ এই প্রথম তিনি একদিনের ছুটিতে বাড়ি ফিরছেন$ বাড়ি গুপ্তকাশী আর অগ্যস্তমুনির মাঝামাঝি বাহেত গ্রামে$

নোটিয়ালের কথা থেকে জানা গেল ১৬ তারিখ সন্ধ্যার পর ১৭ তারিখ সকালে বানের ধাক্কায় বেঁচে যাওয়া মানুষের দুর্গতির কথা$ বানের প্রথম ধাক্কায় বেঁচে যাওয়া তীর্থযাত্রী ও কেদারঘাটির বিভিন্ন কাজের সাথে জড়িয়ে থাকা মানুষজন গৌরিকুণ্ড, রামবাড়া, শোনপ্রয়াগ থেকে এদিক ওদিক পালাতে থাকে$ স্থানীয়রা অনেকে পাহাড়ের ওপরের দিকে ওঠে$ কেউ জলস্রোতের উল্টো দিকে জঙ্গলের মধ্যে পালাতে থাকে$ তীর্থযাত্রীদের মধ্যে অনেকে স্থানীয়দের দেখানো পথে রামবড়া দিয়ে বেরিয়ে আসতে চেষ্টা করে$ কিন্তু সেখানে ব্রিজ ভেঙে যাওয়ার কারণে তাদের আটকে পড়তে হয়$ পরে উদ্ধার কার্য শুরু হলে পাহাড়ের দুইপ্রান্তে দড়ি বেঁধে পার হবার ব্যবস্থা শুরু হয়$ কিন্তু এভাবে ঝুলতে অনভ্যস্ত তীর্থযাত্রীদের অনেকেই দড়িতে বেয়ে যেতে গিয়ে হড়কে নিচে পড়ে যায়$ কেউ কেউ প্রথমে কোনোরকমে পার হয়ে দড়ি ছাড়তেই হঠাৎ টানে থাকা দড়ি আলগা হয়ে পিছনের দিকে ঝুলে আসতে থাকা তীর্থযাত্রীরা হড়কে পড়ে যায় নিচে নদীখাতের জলের স্রোতে$ এভাবেই অগুনতি তীর্থযাত্রী দড়ি বেয়ে পার হতে গিয়ে মুড়িমুড়কির মতো ভেসে যায়$ মানুষ ভেসে যাওয়ার এই বিবরণ শুনে আমাদের মন খুবই খারাপ হয়ে গেল$

গুপ্তকাশীর উদ্দেশ্যে রাতের পাহাড়ে আমরা একাকী

অগস্ত্যমুনি থেকে ট্রেক করে লম্বা চড়াই ভেঙে চলছি তো চলছিই$ সন্ধ্যে নেমে এসেছে$ গুপ্তকাশী যাওয়ার গাড়ি পাওয়া গেল না$ আশেপাশে প্রচুর গাড়ি, বড়ো বাস থেকে শুরু করে ছোটো ছোটো প্রাইভেট কার সার বেঁধে দাঁড়িয়ে$ রাত সাড়ে আটটায় ডান্ডি গ্রামে পৌঁছে যখন গাড়ি পাওয়া গেল না, এমনকী বুক করে যাব বলাতেও মিলল না, তখন ওই গ্রামেই থাকার ব্যবস্থা করতে সচেষ্ট হলাম$ অবস্থাপন্ন, উঁচু জাতের বলবন্ত সিং রানা আমাদের নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে চা খাওয়ালেন। বললেন, একখানা ঘর আছে, থাকার ব্যবস্থা হতে পারে$ কথায় কথায় বলবন্ত জানালেন, একটা গাড়ি আছে, কিন্তু ড্রাইভার নিচু জাতের, দূরে গ্রামে বাড়ি$ এখন এত রাতে গ্রামে চলে গিয়েছে$ শুনেই নোটিয়াল গাড়ির মালিককে সঙ্গে নিয়ে অন্ধকারের মধ্যে ড্রাইভারকে খুঁজতে গেলেন$ তিনি দেড়মাস তাঁর বউ বাচ্চাকে দেখেননি$ আজ রাতে বাড়ি যেতে না পারলে আবার কবে দেখা করতে পারবে কে জানে$ আমরা মনে মনে চাইছিলাম, ড্রাইভার যেন রাজি না হয়$ রাতের বেলায় পাহাড়ে বেরোনোতে আমাদের মন সায় দিচ্ছিল না$

বলবন্ত সিং রানা জানালেন, বান যেদিন আসে, তার আগের দুতিনদিন ধরে স্ট্রাইক চলছিল কেদারনাথে$ হোটেল মালিক থেকে পালকি বাহক প্রায় সব ধরনের ধান্দার লোকেদের একটা বড়ো অংশ স্ট্রাইক করেছিল$ একটা অনশনও চলছিল কেদারে$ এসডিএম গিয়েও কোনো মিটমাট করতে পারেননি$ তাই ১৬১৭ জুন প্রায় তিনদিনের যাত্রী জমা হয়ে গিয়েছিল কেদারনাথ, রামবড়া, গৌরিকুণ্ড, শোনপ্রয়াগে$ ফলে বানে মৃতের সংখ্যা অনেক বেড়ে গিয়েছে$ এই গ্রাম থেকেও মারা গেছে তিনজন$ তাদের বয়স ১৭ থেকে ২৫এর মধ্যে$

কিন্তু নোটিয়াল ড্রাইভারকে রাজি করিয়ে ফেললেন, দুহাজার টাকায় গুপ্তকাশী পর্যন্ত নিয়ে যাবে$ তিনি বললেন, তিনি নাকি ড্রাইভারকে বলেছেন, তুই যে জাতেরই হভাই আমি তোর পায়ে পড়ছি$ নিয়ে চল গুপ্তকাশী$ কী আর করা, অগত্যা রওয়ানা দিলাম, ঘড়ির কাঁটা তখন দশটা ছুঁই ছুঁই$ ড্রাইভারের সঙ্গে তার দুতিনজন দেশোয়ালি ভাই, গাড়ির মালিক আর আমরা চারজন$ ড্রাইভার বাদে সব দেশোয়ালিরাই মদ খেয়ে নিয়েছে$

পথে বৃষ্টি শুরু হল$ এবং আমাদের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়ে বৃষ্টি বাড়তে লাগল$ রাত এগারোটা নাগাদ নোটিয়ালের গন্তব্য এসে গেল$ তিনি নেমে গেলেন$ পাহাড়ি রাস্তায় বৃষ্টির মধ্যে একদিকে পাহাড় আর একদিকে খাদ রেখে রাত্রিবেলা আমাদের গাড়ি চলল$ পথে অন্তত দুজায়গায় দেখলাম, দুটি তেলের ট্যাঙ্কার পাহাড়ে ধস নেমে ফেঁসে রয়েছে$ আমাদের ড্রাইভার খুব পাকা$ পাশের এক চিলতে সরু জায়গা দিয়েই গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেল$ বেশ বুঝতে পারলাম, আজ রাতে যদি গুপ্তকাশী পৌঁছাতে পারি, তাহলে নিজেদের ভাগ্যবান বলে মনে করব$

রাত বারোটা নাগাদ হেডলাইটের আলোয় দেখা গেল রাস্তা জুড়ে ধস$ বৃষ্টির সাথে সাথে ওপর থেকে ঝুরঝুর করে পাথর পড়ছে তখনও$ ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষে ড্রাইভার জানিয়ে দিল, আর যাবে না গাড়ি$ এই ধসটা আমরা পায়ে দ্রুত হেঁটে গেলে এখনও পেরিয়ে যেতে পারি$ এখান থেকে গুপ্তকাশী কয়েক কিলোমিটার মাত্র$ আমরা নেমে এলাম, ভাড়া মিটিয়ে বৃষ্টির মধ্যে দুজন একটা ছাতার নিচে আর একজন মাথায় গামছা দিয়ে পিঠে রুকস্যাক নিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম$ কিলোমিটার খানেক যাওয়ার পর দেখলাম, একটা পুলিশের গাড়ি রাস্তার মধ্যে দাঁড়িয়ে, গুপ্তকাশীর দিকে মুখ করে$ আমরা কাছে যেতেই ভেতর থেকে মুখ বের করে একজন পুলিশ জানিয়ে দিল, গুপ্তকাশী যাওয়া যাবে না, সামনে বিশাল ধস নেমেছে রাস্তায়$ আমাদের মুখ চুন হয়ে গেল, তবু নিরুপায় হয়ে বললাম, দেখি হেঁটে যাওয়া যায় কি না$ আরও কিছুটা হাঁটতেই দেখলাম, রাস্তার যেদিকে খাদ, সেদিকে একটা জিপগাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, পেছনের দরজা নেই$ আমরা ঠিক করলাম, সামনে ধসে যদি আটকে যাই, তবে রাতটা এই জিপেই কাটাবো$ যাইহোক, আরও কিছুটা হাঁটার পর দেখলাম, সত্যিই রাস্তার ওপর বড়োসড়ো একটা ধস, এখনও ঝুরঝুর করে পাথর পড়ছে ওপর থেকে$ কোনোমতেই সেটা পেরোনো সম্ভব নয়$ নোটিয়ালের ওপর ক্ষোভ, নিজেদের ওপর হতাশা আর অন্ধকার অজানা পাহাড়ের ভয় সবকিছু ছাপিয়ে গিয়ে আমরা পিছনে হেঁটে এলাম জিপটার কাছে$ ফাঁকা জিপ$ কেউ ফেলে রেখে চলে গেছে গ্রামে$ পেছনটা ফাঁকা$ একলাফে উঠে পড়ে বুঝলাম, কাকভেজা হয়ে গেছি$ জুতোজামাপ্যান্ট খুলে একটু শুকনো প্যান্টজামা পড়ে নিয়ে জিপের পেছন দিকটায় কোনোরকমে তিনজন বসলাম$ বৃষ্টি তখনও পড়ছে$ মোবাইল খুলে সময় দেখারও কোনো রুচি ছিল না$ বিস্কুটের প্যাকেট থেকে বিস্কুট বের করে খেতেও ইচ্ছে করছিল না$ পঙ্কজ জানাল, এখানে তিন ধরনের ভয় রয়েছে এক, জন্তু জানোয়ারের ভয়$ দুই, পাশের পাহাড় থেকে হঠাৎ ধসের ভয়$ তিন, স্থানীয়রা ভোরবেলা আমাদের চোর বলে পিটতে পারে, তার ভয়$ প্রথম দুটো ভয় আমাদের মনে ধরল, তৃতীয় ভয়টা ততটা গায়ে লাগল না$ তবে আমরা তিনজনেই একটা বিষয়ে একমত হলাম, এত রাতে আমাদের বেরোনো ঠিক হয়নি$ ডান্ডি গ্রামেই থেকে যাওয়া উচিত ছিল$

রাত কেটে গেল নির্বিঘ্নে$ সকালে সেই বড়ো ধসটি কোনোমতে পেরিয়ে আরও অন্তত আধ কিলোমিটার হেঁটে আমরা পৌঁছালাম গুপ্তকাশী, ছোট্ট শহর$ মাঝখানে দার্জিলিং ম্যালের মতো একটু সমতল, সেটাই বড়ো বাজার এলাকা$ অত সকালে আমাদের দেখে দোকানদাররা জিজ্ঞেস করল, আমরা সারারাত হেঁটে এসেছি কি না$ আমরা বললাম রাতে আটকে ছিলাম ধসের কারণে$ চা খেয়ে এদিক ওদিক হাঁটছি কিন্তু খিদেয় পেট চো চো করছে$ অবশেষে প্রায় ৪০ মিনিট বসে থাকার পর একটি দোকানে আমাদের গরম গরম পুরি মিলল$ এই সময়ে এখানে ট্যুরিস্ট গমগম করে, কিন্তু এখন সে ব্যস্ততা আর নেই$ তাই দোকানের ব্যাপারীদের মধ্যে সেই তৎপরতা চোখে পড়ল না$ আমরা ৩০০ টাকায় একটা হোটেলের ঘর নিলাম, সাফসুতরো হয়ে একটু বিশ্রাম নেবার জন্য$ সকালে গুপ্তকাশী পৌঁছে আমরা মেডিকেল টিমের খোঁজ না পেলেও বেলার দিকে মোবাইল সংযোগ পাওয়া গেলে এগারোটা নাগাদ গুপ্তকাশী বাসস্ট্যান্ডে তাদের সাথে আমাদের সাক্ষাতের সময় ঠিক হয়, তারা এখান থেকে কিছু দূরের গ্রাম থেকে মেডিকেল ক্যাম্প সেরে ফিরে আসছে$

মেডিকেল মিশনের সাথে দুদিন

৮। দুপুর বারোটা নাগাদ ণ্ণউত্তরাখণ্ড আপদা রাহাত মঞ্চ‘-র কর্মীদের দুটি টিম উখিমঠ থেকে এল$ টিম লিডার মুনিশ ভাই, নাগরিক পত্রিকার সম্পাদক$ দুজন তরুণ ডাক্তার, একজনের নাম সৌরভ$ আরেকজন অজিত$ আর ছিল মুকেশ ভাই সে স্থানীয়, উত্তরাখণ্ডেরই সমতল এলাকার শ্রমিক গণেশ ভাই, রাজু ভাই, এবং আরও কয়েকজন আমি নাম ভুলে গেছি$ গুপ্তকাশি থেকে ওষুধ কেনা হল$ কেনার আগে আমরা মোট দশ হাজার টাকা দিলাম মুনিশ ভাইয়ের হাতে$ আমাদের মন্থনএর সাড়ে ছহাজার আর কলকাতার ছাত্রযুবদের পত্রিকা আন্দোলনের সংলাপএর বন্ধুদের তোলা সাড়ে তিন হাজার$ পঙ্কজ ভাই ফিরে গেল$ একটা হোটেলে দুপুরের ভাত খেয়ে আড়াইটে নাগাদ আমরা দুটি টিমে ভাগ হয়ে গেলাম$ গুপ্তকাশী আর গৌরিকুণ্ডের মাঝামাঝি গঞ্জ মতো জায়গা ফাটা$ সেখানে আমরা ভাড়া গাড়ি থেকে নেমে গেলাম$ আর একটা টিম চলে গেল বারাসুর দিকে$ ফাটা আসার পথে কুমায়ুন গ্রামের তরুণ মুকেশ আমাদের টিমে ছিলেন$ মুকেশ ওদের গ্রামে মেডিকেল মিশনের কাজ দেখে স্বেচ্ছাসেবক হিসাবেই এই মিশনে যোগ দেন$ তাঁর স্থানীয় পরিচিতি এবং গাড়োয়ালি ভাষা জানার কারণেই গ্রামবাসীদের আমাদের মেডিকেল মিশনের উদ্দেশ্য বোঝাতে সুবিধেই হচ্ছিল$

২৭ জুলাই ফাটার কাছে খাট, খারাই, মুখান্ডা মাল্লা গ্রামগুলিতে যাই ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামগুলিতে প্রাথমিক চিকিৎসা পরিষেবা পৌছে দেবার জন্য$ খাট ও খারাই গ্রাম দুটিতে মূলত পুরোহিত পরিবারের বসবাস$ কিছু ক্ষত্রিয় রাজপুত পরিবারও রয়েছে$ গ্রাম দুটি যথেষ্ট বর্ধিষ্ণু$ কয়েকটি পরিবার বাদে অধিকাংশই স্বচ্ছল এবং জীবিকার জন্য কেদারনাথের ট্যুরিস্ট ব্যবসার সাথে যুক্ত$ প্রত্যেকের পাকা বাড়ি$ অনেকেরই দোতলা$ রঙ করা$ তবে ২৮ জুলাইয়ের মাখান্ডা মাল্লা গ্রামে দুপুরে মেডিকেল ক্যাম্প বসিয়ে আমরা কেদারঘাটিতে আসা তীর্থযাত্রী ও তাকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা উত্তরাখণ্ড সহ আশেপাশের রাজ্য এবং পার্শ্ববর্তী দেশ নেপালের মানুষের অর্থনৈতিক জীবনের নির্ভরশীলতার নানা কথা জানতে পারি$ ১২০টি পরিবারের এই গ্রামটির ৯৫ শতাংশ মানুষ দলিত শ্রেণীভুক্ত$ এই গ্রামের বাসিন্দারা মূলত ডোলি, খচ্চর, পিঠঠু পরিষেবার সাথে যুক্ত$

কেদার ফ্যাক্টরিও নেই, পালিয়েছে লাংকোও

$ ফাটার দুই কিলোমিটারের মধ্যে বড়ো রাস্তার যেদিকে খাদ, সেদিকের (অর্থাৎ নিচের দিকের) গ্রামটির নাম মাখান্ডা তল্লা$ আর যেদিকে পাহাড়, অর্থাৎ ওপরের দিকের গ্রামটির নাম মাখান্ডা মাল্লা$ কংগ্রেসের পঞ্চায়েত। পঞ্চায়েত প্রধান লাক্কি লাল বলিয়ে কইয়ে$ তাঁর দশটি ডোলি আছে, গৌরিকুণ্ড থেকে কেদারনাথ$ তাছাড়া তিনি কেদারের ডোলি ইউনিয়নের একজন মাথা$ তাঁর কাছ থেকে কেদারনাথকে ঘিরে গড়ে ওঠা ধর্মীয় ট্যুরিজম ব্যাবসার কিছু খুঁটিনাটি জানা গেল$ মে মাস থেকে অক্টোবর এই হচ্ছে সিজন$ দেওয়ালির দিন পুজো দিয়ে বন্ধ হয় কেদারের মন্দির$ তার মধ্যে মেজুন মাস, অর্থাৎ বর্ষার ঠিক আগে সবচেয়ে ভিড় হয়$ মেজুনের ভরা ট্যুরিস্ট মরশুমে প্রতিদিন প্রায় ১০১৫ হাজার তীর্থযাত্রী আসাযাওয়া করে$ চল্লিশ বছর আগে সেই সংখ্যাটি ছিল দিনে একশো থেকে দেড়শো জন$ তখন এই মাখান্ডা গ্রামের মধ্যে দিয়েই যেত তীর্থযাত্রীরা খচ্চরে চেপে বা ডোলিতে$ সময় লাগত ২০ থেকে ২১ দিন$ এখন জিপে কয়েক ঘন্টায় যাওয়া যায়$ আর হেলিকপ্টার পরিষেবা শুরু হওয়ার পরে মাত্র ২০২৫ মিনিটেই কেদার দর্শন সেরে চলে আসা যায়$

দলিত সম্প্রদায়ের মজদুর অধ্যুষিত গ্রাম মাখান্ডার প্রধান লাকি লালের মুখের বর্ণনায় কেদারঘাটি হল কেদার ফ্যাক্টরি‘$ তার কথাতেই জানতে পারি গত ১৩ জুন থেকে কেদারঘাটিতে বিভিন্ন পরিষেবার সাথে যুক্ত স্থানীয়দের ডাকা বন্ধ সম্পর্কে$ বেসরকারি অ্যাভিয়েশন কোম্পানিগুলিকে সরকার যথেচ্ছ লাইসেন্স দিতে শুরু করে বছর দুয়েক আগে থেকে$ আগে দুটি কোম্পানি মাত্র তাদের হেলিকপ্টার চালাত$ এখন প্রায় নয় দশটি কোম্পানি দেরাদুন, উখিমঠ, কালীমঠ, ফাটা সহ বিভিন্ন স্থান থেকে হেলিকপ্টারে করে তীর্থযাত্রীদের কেদারনাথ মন্দিরে নামানো ওঠানো করছে$ এতে করে স্থানীয়দের হোটেললজ, ধাবা, ছোটো দোকানদারদের ব্যাবসার ক্ষতি হচ্ছে$ অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ছে খচ্চর, ডোলি, পিঠু, ট্রেকার বা জিপের মতো পরিষেবাগুলি$

লাকি লালের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মরশুমের এই সময়ে সর্বসাকুল্যে মোট ৩৮৭০টি ডোলি চলত$ একটা ডোলি বা পালকি মানে একজন যাত্রী আর চারজন বাহক$ এছাড়াও মালপত্র বহন করার জন্য ছিল খচ্চর আর খচ্চরমালিক$ ডোলি ভাড়া করলে প্রথমেই গৌরিকুণ্ডে ৪২০০ টাকা অগ্রিম দিয়ে ভাড়া করতে হত$ এর মধ্যে ডোলি পিছু মালিকের শেয়ার ২৫০ টাকা, ৩০ টাকা পায় পালকির মধ্যে যে গদি থাকে, তার মালিক, ২৪০ টাকা নেয় জেলা পরিষদ, অর্থাৎ সরকার$ কম্পুটারে রিসিট দেওয়ার বন্দোবস্ত আছে$ বাকি ৩৬৮০ টাকা চারজন ডোলি বাহকের মধ্যে ভাগ হয়$ ডোলি মালিকদের রেজিস্ট্রেশন করতে হয় ২৫০০ টাকা দিয়ে$ একজন ডোলি মালিক সর্বাধিক ১০টি ডোলি চালাতে পারে$ এক একটি ডোলি বানাতে খরচ ৫ হাজার টাকা$ এই অঞ্চলে ডোলি বানানোর আলাদা কারিগর আছে$ তারা সরু সরু বাঁশের মতো দেখতে লকড়ি দিয়ে সেগুলো বানায়$ মাখান্ডা গ্রাম থেকে ৪০টি ডোলি খাটত কেদারঘাটিতে$

কেদারঘাটিতে এই সময় এই ডোলি বাহক, পিঠু বাহক (যারা পিঠে করে যাত্রীদের নিয়ে যায় গৌরিকুন্ড থেকে কেদারনাথ), পোর্টার বা মাল বহনকারীরা আসে পার্শ্ববর্তী রাজ্য জম্মু ও কাশ্মীর, উত্তরপ্রদেশ, হিমাচলপ্রদেশ এবং পাশের দেশ নেপাল থেকে$ নেপাল থেকে আসা পিঠু বাহকদের ছমাসের জন্য পাস নিয়ে নাম নথিভুক্ত করতে হয়$ রেজিস্ট্রেশন ফি ৭০০ টাকা$ পাঁচ বছরের জন্য তা ভ্যালিড$ তবে অনেকেই নতুন মরসুমে পুরোনো কাগজ দেখাতে পারে না, হারিয়ে ফেলে$ আর কিছু (লাকি লালের হিসেবে ২০ শতাংশ) লাইসেন্সবিহীন পিঠু বাহক থাকেই, অনেকেরই প্রথমেই সাতশো টাকা দেওয়ার ক্ষমতা বা ইচ্ছে থাকে না$ সেই সংখ্যাটাও কম করে দেড় দুহাজারের মতো$ মরসুমে প্রায় ৭০০০ নেপালি এপারে এসেছিল$ যাদের মধ্যে হাজার পাঁচেক ছিল নথিভুক্ত$ প্রতিদিন এই সিজনে ৪০০ থেকে ৫০০ ডোলি (অর্থাৎ ১৬০০২০০০ ডোলি বাহক), ঘোড়া খচ্চর মিলিয়ে প্রায় ১০০০ আর পিঠু বাহক ৫০০৬০০ করে যাওয়া আসা করেছিল$ লাকি লালের হিসেব, কেদারঘাটিতে বন্‌ধের কারণে গৌরিকুণ্ড, রামবড়া, কেদারনাথ মিলিয়ে ১৬১৭ জুন প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ হাজার মানুষ আটকে ছিল$

লাকি লাল জানায়, বিপর্যয়ের আগের দিন অর্থাৎ ১৫ জুন সংক্রান্তির পরবের জন্য তাদের গ্রামের প্রায় সকলেই নিচে নেমে আসে$ প্রায় পুরো গ্রামটিই কেদারের ওপর নির্ভরশীল হলেও, এই গ্রাম থেকে ওই বিপর্যয়ে মারা গেছে মাত্র একজন$ রামবড়াতে ধাবা চালাত দিলীপ সিং (৫১), তিনি তাঁর খচ্চর সহ মারা যান$ বাকিরা সকলে বেঁচে যায়$ আমাদের মনে হল, কেদারঘাটিতে বনধ্‌ চলতে থাকায় এই গ্রামের অধিকাংশ ছোটো দোকান মালিক, খচ্চর মালিক বা ডোলি মালিকরা নিজেদের লোকসানের কথা ভেবেও কেদার থেকে নেমে এসেছিল$ এই বনধ্‌ তাদেরই প্রতিনিধিত্বকারী বিভিন্ন ইউনিয়নের তরফে ডাকা হয়েছিল$ এর সাথে শামিল হয়েছিল স্থানীয় তীর্থযাত্রীদের পরিষেবা পেশার সাথে যুক্ত ইউনিয়ন; এমনকী মন্দির সমিতির পাণ্ডারাও$ বন্‌ধের ফলে যাত্রীর সমাগম যেমন বেশি ছিল কেদারে, তেমনি স্থানীয়দের সমাগম কমে গেছিল$

ব্লাস্টিংয়ে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে পাহাড়

১০$ অগস্ত্যমুনি ছাড়িয়ে বিজয়নগর পেরিয়ে ট্রেক করে ওপরে ওঠার সময়েই বুককাঁপানো ডিনামাইটের শব্দ শুনেছিলাম$ পাথর কেটে নয়, ডিনামাইট ব্লাস্ট করে পাহাড় ফাটিয়ে উত্তরাখণ্ডের উন্নয়ন অনেক দিন ধরেই চলছে$ উত্তরাখণ্ড পৃথক রাজ্যের স্বীকৃতি পাওয়ার আগে গোটা এলাকায় পিচ ঢালা রাস্তা ছিল ৮ কিমি$ উত্তরাখণ্ড রাজ্য হওয়ার পর গত দশ বছরে প্রায় ১৫ কিমি রাস্তা করা হয়েছে$ এর বেশিরভাগটাই পাহাড়ে ডিনামাইট ফাটিয়ে$ এমনই বলছিল পঙ্কজ$ সেই ব্লাস্ট করে পাহাড় ফাটানোর ফলে নবীন ভঙ্গিল পর্বতের কী হাল হয়, তা কেউ খতিয়ে দেখার ধার ধারেনি$

রাস্তার সঙ্গে সঙ্গেই যুক্ত হয়েছে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলি$ ছোটো ছোটো খোলা জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নয়$ যেগুলো তৈরি হচ্ছে, সেগুলো বড়ো বড়ো সুরঙ্গ কেটে বানানো জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র$ এমনিতে পাহাড়ি নদীর ধারায় টারবাইন ঘুরিয়ে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করার বন্দোবস্ত, অর্থাৎ খোলা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের চেয়ে সুরঙ্গ কেটে বানানো বড়ো জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে ক্ষতি হয় বেশি, জানালেন ধানি গ্রামের শিব সিং পাটোয়ার$ সুরঙ্গ কেটে বানানো মানে কী? ফাটার কাছে ল্যানকো নামে একটি কোম্পানির জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুরঙ্গ দেখলাম$ গ্রামবাসীরা জানাল, ওই সুরঙ্গটি ৯ কিমি লম্বা$ বস্তুত এই সুরঙ্গ দিয়ে নদীটারই গতি পরিবর্তন করে দেওয়া হয়$ নদীর বেশিরভাগটা বাঁধ দিয়ে আটকে সেই বাঁধের গায়ে সুরঙ্গের একটি মুখ রাখা হয়, যাতে পুরো নদীস্রোতটা ওই সুরঙ্গ দিয়ে চলে যায়$ সেই সুরঙ্গ পাহাড়ের ভেতর দিয়ে কয়েক কিলোমিটার গিয়ে খোলে এমন এক জায়গায়, যেখানে নদী বাঁক ঘুরে এসেছে$ সুরঙ্গের নিয়ন্ত্রিত জলধারায় টারবাইন ঘুরিয়ে সংগঠিতভাবে জলবিদ্যুৎ তৈরি করা যায়$ এই সুরঙ্গ তৈরি করা হয় ব্লাস্ট করে পাহাড় ফাটিয়ে$ অগ্যস্তমুনি, রুদ্রপ্রয়াগ, গুপ্তকাশী, ফাটা এলাকার যে লোকেদের সঙ্গেই আমরা কথা বলেছি, তারাই বলেছে, জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কারণে ব্লাস্টিং করে করে পাহাড় ঝুরঝুরে হয়ে গেছে$ তাই একটু মেঘ ভাঙা বৃষ্টিতেই নামছে ব্যাপক ধস$ ফাটার কাছে সেরিগাঁওতে লোকে রাত্রে একটু বৃষ্টি হলেই ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসছে$ পরস্পর বাড়ির দিকে টর্চের আলো ফেলে জানান দিচ্ছে নিজেদের অস্তিত্বের কথা$ আর একটা গ্রাম, উনিশ ঘর মতো, নাম মনে নেই, বাসিন্দারা রাত্রে কেউ গ্রামে থাকছে না$ চলে আসছে ফাটা শহরে$ আত্মীয়স্বজনদের বাড়িতে$

ব্লাস্টিং শুধু নয়$ বড়ো বড়ো সুরঙ্গ পাহাড়ের যেখান দিয়ে গেছে, তার ওপরে যেসব গ্রাম রয়েছে, সেগুলোর বাড়িগুলিতে ফাটল দেখা দিয়েছে$ যেমন মাখান্ডা মাল্লা$ প্রত্যেকটি বাড়িতে ফাটল$ ল্যানকো কোম্পানির সুরঙ্গের কাজ শুরু হওয়ার পর গ্রামে প্রতিবাদ হয়েছিল$ গ্রামের সব পরিবারগুলোকে ২ থেকে ১০ হাজার টাকা করে দিয়ে প্রতিবাদ বন্ধ করে কোম্পানি$ কাকে কত টাকা দেওয়া হবে তা ঠিক হয়েছিল, কার গলার জোর কত তা দিয়ে$ পুলিশ প্রশাসনকে জড়ো করে বন্দুকের ডগায় করা হয়েছিল লোকদেখানো জনশুনানি$ বলা হয়েছিল, গ্রামের প্রচুর উন্নতি করা হবে$ রাস্তা থেকে কম্পিউটার সেন্টার সব$ চাকরি দেওয়া হবে ল্যানকো কোম্পানিতে$ কিন্তু ৫ বছরে এখনো পর্যন্ত জনা পনেরো যুবককে চাকরি দিয়েছে ল্যানকো$ বেতন বাড়েনি একটুও তাদের$ এই চিত্র মাখান্ডা মাল্লা গ্রামের$ নিশ্চয়ই অন্যান্য গ্রামেরও একই হাল$ ও হ্যাঁ, মাখান্ডা গ্রামের একপাশে একটা প্রস্রবণ ছিল$ প্রাকৃতিকভাবেই মাটি ফুঁড়ে জল উঠত$ কিন্তু গ্রামের নিচ দিয়ে সুরঙ্গ যাওয়ায় সেই জল বন্ধ হয়ে গেছে$ এখন জল আনতে অনেক দূর যেতে হয়$

কেদারঘাটির বিপর্যয়ের পর ল্যানকোর কাজ বন্ধ হয়ে গিয়েছে$ মাখান্ডা গ্রামের অনেকের আশঙ্কা, ওই কাজ আর শুরু হবে না$ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বিপর্যয়ে$ সুরঙ্গ কাটতে গিয়ে বের হয়ে আসা পাহাড়ের পাথরের টুকরো তারা জমিয়ে রাখত খাদের ধারে$ তার বেশির ভাগটাই জলের ধাক্কায় নদীখাতে গিয়ে পড়ে নদীখাত অনেক উঁচু করে দিয়েছে$ কোম্পানির বহু কোটি টাকা দামের মেশিনপত্র ভেসে গেছে বানে$

দৈবি আপদা

হিন্দি দৈনিক জাগরণ‘-এর ক্যাচলাইন বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পঠিত সংবাদপত্র$ আক্ষরিক অর্থেও হয়তো তাই$ সেই মেগা মিডিয়া তার উত্তরাখণ্ড নিয়ে রিপোর্টিং শুরু করে বিপর্যয়কে দৈবি আপদা বা দৈবী বিপর্যয় নাম দিয়ে$ ২৪ তারিখের কাগজে দেখছিলাম, একটি রিপোর্টিংএর প্রতিটি প্যারাগ্রাফ শুরু হয়েছে দৈবি আপদাকথাটা দিয়ে$ আমরা যে অঞ্চলে গেলাম, সেখানকার বেশিরভাগ মানুষ অবশ্য তেমন মনে করে না$ যেমন ধানি গ্রামে শিব সিং বা খাড়াই গ্রামের এক মহিলা যিনি মায়ের দিকের ১৯ জন আত্মীয়কে হারিয়েছেন, তাঁদের কথায় সরকার ১৪ তারিখেই আবহাওয়া দপ্তর থেকে জানতে পেরেছিল, এমন একটা কিছু হতে চলেছে কেদারনাথে$ কিন্তু সরকার তা জানায়নি পাবলিককে$ যদি আমরা জানতে পারতাম, তাহলে দুঘন্টার মধ্যে কেদারঘাটি, রামবড়া, গৌরিকুন্ড, শোনপ্রয়াগ থেকে মানুষকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে আসা যেত$ তাছাড়া সরকার উদ্ধারকার্য শুরু করেছে ২১ জুন থেকে$ অথচ ১৬১৭ তারিখেই ঘটেছে বিপর্যয়$ কেউ কেউ উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রীকে জুতো মারার কথাও বললেন$

সরকার থেকে শুরু করে ধর্মগুরু, ট্যুর অপারেটর থেকে কর্পোরেট প্রত্যেকেরই দেখলাম উত্তরাখণ্ড সহ কেদারনাথের বিপর্যয়কে দৈবি আপদা বলে অভিহিত করার একটা চেষ্টা রয়েছে$ ব্রাহ্মণদের বাস যে গ্রামে, যেমন খাট গ্রাম সেখানেও একটা এরকম প্রবণতা লক্ষ্য করলাম$ এই ব্রাহ্মণদের গ্রামগুলিকে সরকার বেশ তোষামোদ করছে$ ব্রাহ্মণ অধ্যুষিত একটি গ্রাম লামগোণ্ডীতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মৃত পিছু পাঁচ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করেছেন$ আবার এই খবরও শুনলাম, স্থানীয় এমএলএ কেদার এলাকায় গিয়ে মার খেয়েছেন লোকের হাতে$ ফিরে আসার পর শুনলাম, কেদারে মন্দাকিনি নদী পেরোতে গিয়ে মহকুমা শাসক নদীতে পরে মারা গেছেন$

ধানি বা মাখান্ডার খেটে খাওয়া পরিবারগুলো এবং খাট বা খাড়াই গ্রামের কেদারের পাণ্ডা পুরোহিত অধ্যুষিত পরিবারগুলো এই দুয়ের মধ্যে কেদারঘাটির বিপর্যয়ের চরিত্রায়ণে ফারাক রয়েছে$ ধানি গ্রামের এক বয়স্ক দোকানি আমাদের এমনও বললেন, কেদারনাথকে ঘিরে এই বাণিজ্যের কারণে লোকসমাগম বেড়ে গেছে, প্রচুর গাড়ি চলছে, হেলিকপ্টার চলছে ফলে দূষণ বাড়ছে$ তার সঙ্গে এই বিপর্যয়ের যোগ রয়েছে$ মেঘভাঙা বৃষ্টি বেড়ে গেছে$ খেটে খাওয়া মানুষ এই বিপর্যয়ের পেছনে সরকারি ব্যর্থতা, জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেল ও ব্লাস্টিং, সার্বিক দূষণ এসবকে দেখছে$ তাদের কথায় স্পষ্ট, মানুষের হাত কোম্পানির হাত নীতি নির্ধারকদের হাত$ আর নীতি নির্ধারক, বড়ো মিডিয়া, কর্পোরেট আর পুরোহিত পাণ্ডারা (সিজনে একেক মাসে এদের দেবতার দালালিতে কয়েক লক্ষ টাকা রোজগার হয় বলে জানা গেল)$ এর পেছনে ভগবানের হাত দেখছে$ দেবতার হাত দেখনেওয়ালাদের সবথেকে প্রগতিশীল অংশটি বলছে, দেবতা কেদারে শুধু শিবমন্দিরটা রেখেছে, বাকি সব আপদ ভাসিয়ে নিয়ে গেছে$

তবে বিপর্যয়ের ধাক্কা এখনও সামলে উঠতে পারেনি কেদারঘাটির আশেপাশের ৫০৬০ কিমি দূরত্ব পর্যন্ত গ্রামগুলির মানুষ$ প্রায় প্রত্যেক গ্রাম থেকেই কেউ না কেউ মারা গেছে$ রোজগার এক্কেবারে বন্ধ$ চাষ করে দিন চলবে না$ অনেকেই ভাবছে এলাকা ছেড়ে দিল্লি চলে যাওয়ার কথা$ অভিবাসনের কথা$ আমাদেরকে কেউ কেউ জিজ্ঞেস করল কলকাতায় কাজ মিলবে কিনা? ৩০ জুলাই আমাদের সঙ্গীসাথিরা গুপ্তকাশিতে একটি শোকসভা আয়োজন করেছিল$ তাতে যেসব গ্রামে মেডিক্যাল ক্যাম্প বসানো হয়েছিল, সেইসব গ্রামগুলো থেকে পয়সা খরচ করে এসে প্রায় দেড়শো মানুষ অংশ নিয়েছিল$ কিন্তু কোনো প্রতিবাদী কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার জন্য সংগঠকরা যখন গ্রামবাসীদের আহ্বান জানায়, তখন গ্রামবাসীরা তা প্রত্যাখ্যান করে$ বলে, এখন তাদের ওদিকে মন নেই$

ফেরার পথে জিপে আসতে আসতে দেখছিলাম অগস্ত্যমুনি থেকে শ্রীনগরের রাস্তা ফাঁকা$ বাস, ট্রেকার সবেতেই সওয়ারী কম$ এদের বাসচালক, কন্ডাক্‌টর, জিপ বা ট্রেকারের ড্রাইভারের মুখের দিকে তাকালেই চোখে পড়ে বিষণ্ণতা$ অগস্ত্যমুনি থেকে জিপে ফেরার পথে সমস্ত রাস্তাটাই প্রায় শুনসান$ অন্যবার এদিকে এসে ট্যুরিস্টদের লাগেজ বোঝাই যে জিপগুলি পাশ দিয়ে বেড়িয়ে যেত তার কোনো দেখা এবার মিলল না$ দেখে মনে হচ্ছে এক অঘোষিত বন্ধ পালিত হচ্ছে কেদারগামী এই পথ জুড়ে$ ফেরার সময় কোথাও কোনো রাস্তা মেরামতির তোড়জোড় চোখে পড়ল না$ মাত্র দুটি জায়গায় কয়েকজনকে দেখলাম পাথর ভাঙতে, তাও সেরকম কিছু নয়$ মনে পড়ল ক্রান্তিকারী মজদুর সংঘের অমিত কুমারের কথা, তিনি আমাদের বলেছিলেন এখানে শারীরিক শ্রমের কাজের শ্রমিক মূলত আসে বাইরে থেকে$ হিমাচলপ্রদেশ, বিহার, উত্তরপ্রদেশ, এমনকী বাংলা থেকেও$ কেদার বিপর্যয়ের পরে এই সড়কশ্রমিকদের আর হদিশ নেই$ হয়তো বিপর্যয়ের আতঙ্কে সকলেই এই মুলুক ছেড়ে পালিয়েছে$ আমরাও এখন পালানোর তাড়নায় চলেছি, মন্থনের রিপোর্ট পাঠাতে হবে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব$

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s