একটি রাজনৈতিক ফাঁসি

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক নির্মালাংশু মুখার্জীর প্রবন্ধ A Political Hangingএর অনুবাদ তাঁর অনুমতিক্রমে প্রকাশিত হল। বঙ্গানুবাদ করেছেন তমাল ভৌমিক।

এক

তিহার জেলে গোপনে আফজল গুরুর ফাঁসি ও কবর দেওয়ার পর থেকে যেভাবে এই প্রাণদণ্ডের ঘটনা হয়েছে তার জন্য সরকারকে অনেক লেখকই সঠিকভাবে দোষারোপ করছেন। যাই হোক না কেন, একবার যখন রাষ্ট্র একজনকে ফাঁসি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন সেই হত্যাকাণ্ড ণ্ণস্বচ্ছতার সঙ্গে ণ্ণমর্যাদাপূর্ণভাবে হল কিনা সেটা মূলত একটা নন্দনতাত্ত্বিক প্রসঙ্গ। কিন্তু হত্যাকাণ্ড শুরু হল যেপ্রক্রিয়া থেকে তা খুব জরুরি জ্ঞানতাত্ত্বিক আলোচনার বিষয়।

যে সময়ে ও যেভাবে এই ফাঁসিটা দেওয়া হল তা নিঃসন্দেহে সরকারের রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি প্রকট করে তোলে। গ্রেপ্তার হওয়ার শুরু থেকে ক্ষমাভিক্ষার আবেদন প্রত্যাখ্যান পর্যন্ত আফজল গুরুর কেসের সমস্ত ঘটনাকে যদি আমরা খেয়াল করি তাহলে এই রাজনৈতিক বিবেচনাপ্রসূত দুরভিসন্ধির ব্যাপারটা আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রপতি ক্ষমাভিক্ষার আবেদন প্রত্যাখ্যান করার মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে তাঁর ফাঁসি হয়ে যাওয়াটা ওই রাজনৈতিক প্রক্রিয়ারই অবশ্যম্ভাবী পরিসমাপ্তি।

মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণের দুটি অংশ আছে। প্রথম অংশটা হল : ভারতের সুপ্রিম কোর্টে প্রাণদণ্ড ঘোষণা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার প্রক্রিয়া শেষ হয়ে যাওয়া; পরের অংশ হল : ভারতীয় সংবিধানের ৭২()(সি) ধারা অনুসারে তা প্রেসিডেন্টের এক্তিয়ারে চলে যাওয়া। আমার মতে আফজল গুরুর চূড়ান্ত ঘোষণার পিছনে বিদ্বেষপূর্ণ রাজনৈতিক মনোভাব একটা বিরাট ভূমিকা নিয়েছিল। রাজনৈতিক প্রয়োজনে আফজল গুরুকে হত্যা করা দরকার ছিল, তাই এই প্রাণদণ্ড। কিছু লেখক, আমিও তার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত, খানিক আন্দাজে এই সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন। এখন আমার মনে হচ্ছে এই ভাবনাটা আরও খুঁটিয়ে দেখা যায়। সুপ্রিম কোর্টে আফজলের পক্ষের উকিল প্রবীণ আইনজীবী সুশীল কুমার যে দুটো সাক্ষাৎকার দিয়েছেন সেখান থেকেই শুরু করা যায়। আসামী পক্ষের উকিল হিসেবে তিনি এই কেসটাকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন এবং তাঁর মতে এই বিচারটা একদমই গ্রহণ করা যায় না। কেন, তা দেখাটাই গুরুত্বপূর্ণ।

আইনিবিচারের দিক থেকে দেখলে মূল কথাটা হল এই। এমনকী যেদিন আফজল গুরুর ফাঁসি হয় সেদিনও সুশীল কুমার এই কথাটাই ভেবেছেন যে বিশেষভাবে সন্ত্রাসীদের কেসে সিদ্ধান্ত টানা হয় স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে; কারণ সন্ত্রাসবাদীদের মূল পরিকল্পনা ও সংগঠন সব সময়েই রহস্য দিয়ে ঢাকা। তাই এই কেসগুলোকে পোক্ত করতে স্বীকারোক্তি সঠিক প্রমাণ করার জন্য পারিপার্শ্বিক বিষয়গুলোকে সাক্ষ্য হিসেবে দাঁড় করানো হয়। আবার পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যপ্রমাণও দাঁড়িয়ে থাকে স্বীকারোক্তির জোরে। তাতে করে বিচারব্যবস্থার সামনে হাজির করা তথ্যসাবুদে যে কারচুপি করা হয়নি তা বোঝানো যায়।

বিস্তারিত পড়ুন

Advertisements

মণিপুরের ভুয়ো সংঘর্ষ সুপ্রিম কোর্ট নিয়োজিত কমিশনের রিপোর্ট ও সুপারিশ

আমি নীনা, ইইভিএফএএমএর সেক্রেটারি। ২০০৮ সালের ৪ নভেম্বর আমাদের পরিবারের দুপুরের খাওয়াদাওয়ার পরে আমার স্বামী নঙমেইথেম মাইকেল তাঁর এক বন্ধুর বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। সেই বন্ধুর বাবার শ্রাদ্ধের অনুষ্ঠানের আয়োজনে সাহায্য করার দরকার ছিল। সেখানে দুপুর তিনটে নাগাদ তাঁর কাছে একটা ফোন এসেছিল। তিনি বেরিয়ে গিয়েছিলেন। ৩টে ৩২ মিনিটে আমি ওঁর কাছ থেকে একটা ফোন পেলাম যে তাঁকে সন্দেহ করা হচ্ছে, আমি যেন ওঁর বোনকে ঘটনাটা জানাই। বোনের সঙ্গে পুলিশের ভালো যোগাযোগ ছিল, তাতে ওঁর ছাড়া পেতে সুবিধা হবে। আমি ঘটনাটা বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। তাই নিশ্চিত হওয়ার জন্য ওঁকে আবার ফোন করলাম। কিন্তু এবার তিনি ফোন ওঠালেন না। ফোনটা অন্য একজন তুললেন। যখন আমি তাঁকে আমার স্বামীর কথা জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি জানালেন, আমার স্বামী বাথরুমে গেছেন। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনারা এখন কোথায় আছেন? তিনি জবাব দিলেন, ওঁরা আমাদের বাড়ির কাছেই আছেন।

আমি ওঁর বোন আর পরিবারের সকলকে জানালাম। তাঁরা বিভিন্ন পুলিশ স্টেশনে যোগাযোগের চেষ্টা করলেন। কিন্তু কোনো লাভ হল না। রাত নটার সময় আইএসটিভির সংবাদে আমি আমার স্বামীর নিথর দেহটা দেখতে পেলাম; ওঁকে সংঘর্ষে নিহত একজন মিলিট্যান্ট বা টেররিস্ট হিসেবে দেখানো হল, ওঁর দেহের পাশে নাকি একটা হ্যান্ড গ্রেনেড পাওয়া গেছে। আমি দেখে হতবাক হয়ে গেলাম, কীভাবে আমার স্বামীকে টেররিস্ট ছাপ দিয়ে মেরে ফেলা হল! …

মণিপুরে অবৈধভাবে হত্যা হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারবর্গের একটি সংস্থা ইইভিএফএএম (একস্ট্রাজুডিসিয়াল একজিকিউশন ভিক্টিম ফ্যামিলিজ অ্যাসোসিয়েশন মণিপুর) এবং অন্যান্যদের ২০১২ সালের একটি আবেদনের ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্ট ৪ জানুয়ারি ২০১৩ একটি কমিশন গঠন করে। এই কমিশনে নিযুক্ত চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত বিচারক এন সন্তোষ হেগড়ে এবং দুই সদস্য জে এম লিংদো ও ডঃ অজয় কুমার সিংকে ১২ সপ্তাহ সময় দেওয়া হয় সম্পূর্ণ তদন্ত করে রিপোর্ট পেশ করার জন্য। যদিও আবেদনকারীরা ভুয়ো সংঘর্ষে ১৫০০র বেশি হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্ত সুপ্রিম কোর্টে তুলে ধরেছিলেন, কিন্তু ২০০৯২০১০ সালের প্রথম ৬টি ঘটনা নিয়ে কমিশনকে তদন্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। কমিশন ৩০ মার্চ রিপোর্ট পেশ করে। এতে প্রমাণিত হয়, এই ৬টি ঘটনায় মৃত আজাদ খান, খাম্‌বঙমায়ুম অর্সনজিত, নামেইরাকপাম গোবিন মেইতেই, নামেইরাকপাম নোবো মেইতেই, এলাঙবাম কিরণজিত সিং, চোঙথাম উমাকান্ত এবং আকোইজাম প্রিয়ব্রত কোনো সংঘর্ষে যুক্ত ছিলেন না এবং তাঁরা আদৌ আত্মরক্ষার জন্য (নিরাপত্তা বাহিনীর) কারোর দ্বারা খুন হননি, অর্থাৎ এঁদের একতরফাভাবে হত্যা করা হয়েছে।

বিস্তারিত পড়ুন