নিয়ন্ত্রণী সমাজ : উপসংহারের পরের কথা

জিল দেল্যুজ

১. ঐতিহাসিক
ফুকো অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে নিয়মানুবর্তী সমাজের উপস্থিতি চিহ্নিত করেছিলেন। বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় সেগুলি তাদের শিখরে পৌঁছেছিল। সেগুলি এগিয়ে যাচ্ছিল বিশালাকার পরিবেষ্টনগুলির এক সংগঠনের দিকে। ব্যক্তি সেখানে অবিরত এক পরিবেষ্টন থেকে অপর একটিতে যেত, প্রতিটি পরিবেষ্টনের ছিল নিজস্ব কিছু নিয়ম : প্রথমে পরিবারে, তারপর স্কুলে (‘তুমি আর নিজের বাড়িতে নেই’), তারপর ব্যারাকে (‘তুমি আর স্কুলে নও’), তারপর কারখানায়, মাঝেমাঝে হাসপাতালে, হয়তো কখনো কারাগারে, যা নিজেই চমৎকার এক পরিবেষ্টন। কারাগারই হল পরিবেষ্টনের আদর্শ মডেল : রোসেলিনির ইউরোপা’৫১-এর নায়িকা কিছু শ্রমিককে দেখে চমকে গিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম সাজাপ্রাপ্ত কিছু লোক দেখছি!’ [অনুবাদকের নোট : ১৯৫২ সালে ইতালিয়ান চলচিত্র পরিচালক রবার্তো রোসেলিনির সিনেমা ইউরোপা’৫১ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ইউরোপের একটি চিত্রায়ণ। নায়িকা রোম শহরের এক ধনী ঘরের বউ, একমাত্র সন্তানের আকস্মিক মৃত্যুর পর সে এক কমিউনিস্ট বন্ধুর পাল্লায় পড়ে রোমের গরীব পাড়ায় যাতায়াত শুরু করে। সেই পাড়ার এক ছয় সন্তানের মা-কে একটি কারখানায় কাজ পাইয়ে দিতে গিয়ে সে প্রত্যক্ষ করে কারখানা, শ্রমিক।]
ফুকো চমৎকারভাবে পরিবেষ্টনের এই আদর্শ প্রকল্পটি ব্যাখ্যা করেছিলেন, যা বিশেষভাবে কারখানায় দেখা যায় : এক জায়গায় জড়ো করা; জায়গাটাতে ভালোভাবে ছড়িয়ে দেওয়া; সময়ে সময়ে আদেশ করা; ওই স্থান-কালে একটা উৎপাদিকা শক্তি গড়ে তোলা, যার ফলাফল তার অংশগুলির শক্তির সমষ্টির তুলনায় বেশি হয়। কিন্তু ফুকো এই প্রকল্পের সার কথাটিও জানতেন : এটা এসেছে এক সার্বভৌম সমাজের পরে, যার লক্ষ্য এবং কার্যপ্রণালী ছিল সম্পূর্ণ আলাদা (উৎপাদন সংগঠিত না করে তার ওপর কর চাপানো; জীবন কীভাবে চলবে তা ঠিক না করে মৃত্যুর আইন জারি করা)। আস্তে আস্তে এই অতিক্রমণ ঘটেছে, এবং নেপোলিয়নকেই মনে হয় এই এক সমাজ থেকে অন্য সমাজে ব্যাপক রূপান্তরের কারক। কিন্তু এই নিয়মানুবর্তিতা এবং তার প্রণালী একটা সংকটে পড়ল, যখন নয়া শক্তিগুলি জিইয়ে উঠল। এই নয়া শক্তিগুলি ক্রমান্বয়ে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছিল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তা গতি পেল : নিয়মানুবর্তী সমাজ, যেখানে আমরা খুব একটা আর ছিলামও না, সেই সমাজে আর আমরা একেবারেই থাকলাম না।

বিস্তারিত পড়ুন

প্রতিবাদের বাজার

চাল-ডাল-নুন-তেল, শিক্ষা-দীক্ষা, শরীর-স্বাস্থ্যের মতো প্রতিবাদও সমাজবদ্ধ মানবজীবনে অত্যাবশ্যকীয়, তা আমরা সবাই জানি। বলা হয়, অন্যায় সহ্য করা অন্যায় করার মতোই অপরাধ। এটা ঠিক কিনা ভাবা যেতে পারে। তবে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা বা তার চেষ্টা করা, তা সে ব্যক্তিগত স্তরে হোক বা সামাজিক স্তরে, নিঃসন্দেহে সুস্থতার লক্ষণ।
একসময় ওই চাল-ডাল-নুন-শিক্ষা-স্বাস্থ্য প্রভৃতিও বাজার থেকে কেনার চল ছিল না। কিন্তু গত কয়েক দশকে সমাজ জুড়ে অতি দ্রুত চাল-ডাল থেকে সকাল-সন্ধের টিফিন, জল থেকে শুরু করে প্রেম-ভালোবাসা-যৌনতা, শিক্ষা-দীক্ষা থেকে শুরু করে সুস্থভাবে বেঁচে থাকা — সব কিছুরই পণ্যায়ণ অর্থাৎ বাজার-যাত্রা ঘটেছে গণহারে। ব্যক্তিগতভাবে দেখলে তাতে ভালো-মন্দ দুই-ই হয়েছে, আর সমাজ আরও ছাড়াছাড়া, ছানাকাটা হয়ে গেছে। কমেছে পারস্পরিক বিশ্বাস, সামাজিক নিরাপত্তা, উষ্ণতা। এমনকী এই বাজারে পুলিশ পোস্টিং করে ধর্ষণ-শ্লীলতাহানি ঠেকানোর দাবিও আর সকলের কাছে অবাস্তব বলে মনে হচ্ছে না।
সমস্ত অত্যাবশ্যকীয় কিছুরই যদি পণ্যায়ণ হতে পারে, তাহলে প্রতিবাদই বা পড়ে থাকবে কেন? প্রতিবাদীর পণ্যায়ন তো আমরা দেখেই আসছি। সেদিনের চরম প্রতিবাদী মমতা তাঁর মার্কেট ভ্যালু বাড়িয়েছেন, শেষমেষ ক্ষমতায় এসেছেন ওই প্রতিবাদের জোরেই। তারও অনেক আগে থেকে অনেক প্রতিবাদীরই সরু চালের বন্দোবস্ত হয়েছে তারা প্রতিবাদী ছিল বলেই। বিভিন্ন ধরনের সরকারি আধাসরকারি বেসরকারি অসরকারি মাসোহারা মিলেছে তাদের। প্রতিবাদেরও পণ্যায়ন হয়েছে। শুরু যদি হয় পার্টির হাত ধরে, ক্ষমতায় যাওয়ার হাতিয়ার হিসেবে প্রতিবাদকে ব্যবহার করার মধ্যে দিয়ে, তাহলে আজ বড়ো ও কর্পোরেট ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রতিবাদের ডাক, প্রতিবাদের সংগঠন, প্রতিবাদের প্রচার আর প্রতিবাদের ধারাবিবরণীর হাত ধরে তার ষোলোকলা পূর্ণ হয়েছে। টিভি ক্যামেরার দিকে তাক করে ঠিক করা হচ্ছে প্রতিবাদের কানুন, কায়দা, আদব। নিজেরই প্রতিবাদ টিভির পর্দায় বা বড়ো কাগজে দেখে/দেখিয়ে তাজ্জব বনছেন/বানাচ্ছেন সৎ প্রতিবাদী। ধার কমছে প্রতিবাদের।

চিঠি

বিষয় : হিসাবপত্র প্রকাশ

হিসেবের খাতা নিয়েছি যখন হাতে
দেখেছি অনেক রক্ত খরচ তাতে।।
কবি সুকান্ত অবশ্য অন্যরকম হিসেবের কথা বলেছিলেন — শোষণের বিরুদ্ধে তাঁর অমর লেখনী গর্জে উঠেছিল। এখানে আমরা অবশ্য অন্যরকম হিসেবের আলোচনা করব। ছেলেবেলা থেকেই অনেক প্রবাদের মধ্যে শুনে আসছি ‘হিসেবের কড়ি বাঘে খায় না’ অস্যার্থ — হিসেবের টাকা কখনো মাঠে মারা যায় না। হিসাব হিসাবই। তার কোনো বিকল্প বিকল্প নেই বা তার কোনো অন্যথা হতে পারে না। আধুনিক জীবনযাত্রায় জীবনের প্রতি পদক্ষেপে হিসেব করে চলতে হয়। না হলে কোনো না কোনো ভাবে হিসাব পরীক্ষকের কবলে পড়ে বিভ্রান্ত ও ব্যতিব্যস্ত হতে হয়। পারিবারিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে নাজেহাল ও পর্যদুস্ত হতে হয় এবং ঋণভারে জর্জরিত হতে হয়। ঋণ করে ঘি খাওয়ার ফল হাতে হাতে নাকের জলে চোখের জলে পেতে হয়।
বিস্তারিত পড়ুন

শীর্ণ এই নাগরিক সমাজ

সৌরীন ভট্টাচার্য

রাষ্ট্র নিয়ে তো প্রশ্ন অনেকদিন ধরেই ছিল। এখন কিন্তু একটা প্রশ্ন উঠে পড়ছে রাজনীতি নিয়েই। আরও নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে রাজনৈতিক দল নিয়ে। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর যা কাণ্ডকারখানা তাতে মানুষ তাদের উপর যারপরনাই বিরক্ত। দুর্নীতি দলবাজি গুন্ডামি খুনোখুনি, অকারণ রেষারেষি ইত্যাদি যত ভালো ভালো কাজ সবেতেই আমাদের বর্তমানের রাজনৈতিক দলগুলোর কোনো জুড়ি নেই। তাদের মধ্যে উনিশ বিশ তফাত নিয়ে গবেষণা যাঁরা করবেন তাঁরা করুন। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের তাতে খুব উৎসাহের বেশি কারণ নেই। আমরা মোটা দাগে যা দেখি তাতে আমাদের বিরক্তি ও অনুৎসাহের পক্ষে যথেষ্ট। সেটাই ঘটছে। মানুষ এই চেনা রাজনীতির ছক সম্বন্ধে এত তেতো হয়ে আছে যে সেসব নিয়ে সে নিতান্ত নিস্পৃহ। সংসারী মানুষ তার অন্য নানা কাজে ব্যস্ত। অন্য নানাদিকে তার উৎসাহ চারিয়ে যাচ্ছে। কেউ দু-বেলা দু-মুঠো জোটাতে কালঘাম ছোটাচ্ছে, কেউ উপচে-পড়া আহ্লাদ সামলাতে ব্যস্ত। রাজনীতির প্রকৃতি ও প্রকরণ নিয়ে তার অত মাথাব্যথা কেন হবে।
বিস্তারিত পড়ুন

জাফর পানাহির সঙ্গে সাক্ষাৎকার

পাভেল সম্পাদিত ‘পারেজিয়া’ পত্রিকার ‘শিল্পীর কণ্ঠরোধ’ বিষয়ক ২০১৩ সংখ্যায় প্রকাশিত সাক্ষাৎকারটি এখানে সম্পাদকের অনুমতিক্রমে পুনঃপ্রকাশিত হল। সাক্ষাৎকারটি অনুবাদ করেছেন স্মৃতি মুখোপাধ্যায় ও পাভেল।

পারেজিয়া : আপনার তৈরি ফিল্ম ‘অফসাইড’। যে ছবিও আপনার অন্য অনেক ছবির মতো নিষিদ্ধ হয়েছে। এই ছবি তৈরির আইডিয়া আপনার কীভাবে এল?
জাফর : আমার মনে আছে, আজ থেকে কয়েক বছর আগে, আমি যখন একটা ফুটবল ম্যাচ দেখতে স্টেডিয়ামে যাচ্ছিলাম, আমার মেয়েও আমার সঙ্গে যেতে চেয়েছিল। আমি তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম যে ইরানে মহিলারা স্টেডিয়ামে যেতে অনুমতি পায় না। কিন্তু সে অনেক জেদ করার পরে আমি তাকে নিয়ে গিয়েছিলাম। স্টেডিয়ামের কাছে যেতেই সে আমাকে ভিতরে যেতে বলল, কারণ তাকে অনুমতি দেওয়া হল না। দশ মিনিট পরে আমি দেখলাম, সে স্টেডিয়ামে প্রবেশ করছে। সেদিন আমি উপলব্ধি করলাম যে, ‘সবসময় একটা রাস্তা রয়েছে’। যদি কিছু পরিবর্তন করতে চাই, তবে এই ভাবনা থেকেই শুরু করতে হবে।
পারেজিয়া : আপনি ফুটবলকেই আপনার ফিল্মের বিষয় হিসাবে বেছে নিলেন কেন?
বিস্তারিত পড়ুন

জাফর পানাহি এবং ইরানের নিষিদ্ধ ফিল্ম

পাভেল

‘Yol’-এর স্ক্রিপ্ট লিখছেন ইয়ালমাজ্‌ গুণে (১৯৮০-৮১)। জেলে বসে। জেল মানে কিন্তু গৃহবন্দি নয়। খোদ লোহার গরাদওয়ালা জেল। আর রোজ নিয়ম করে এসে তাঁর চিফ অ্যাসিস্টান্ট ডিরেক্টর শেরিফ গোরেন স্ক্রিপ্টের টুকরো টুকরো অংশ বুঝে নিচ্ছেন। কারণ পরিচালক নিজে স্পটে থাকতে পারবেন না।
এভাবেই তৈরি হয়েছিল বিখ্যাত পরিচালক ইয়ালমাজ্‌ গুণের অন্যতম সেরা সিনেমা ‘Yol’। তাঁর নির্দেশ মতোই শেরিফ ছবি তৈরির কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন। জেল থেকে পালিয়েই গুণে ফিল্মের নেগেটিভ নিয়ে চলে যান সুইজারল্যান্ডে এবং পরে সেই ‘র স্টক’ প্যারিসে নিয়ে এডিট করেন।
১৯৮২ সালে ‘কান্‌ ফিল্ম ফেস্টিভাল’-এ এই টার্কিশ ফিল্ম ‘পাম দে অর’ পুরস্কার পায়। তুরস্কের জেলে বসে ইয়ালমাজ্‌ যখন তাঁর এই ফিল্ম বুনছেন, জাফর তখন কোথায়?
জাফর তখন যুদ্ধে। ১৯৮০-তে ইরান-ইরাক যুদ্ধে ইরানের হয়ে সিনেমাটোগ্রাফার হিসাবে কাজ করছেন। দিনের পর দিন এই যুদ্ধক্ষেত্র তাঁর মস্তিষ্কের খোপগুলির (brain quotient) ভাণ্ডার ভর্তি করছিল। ১৯৮১ সালে ইরাকের কুর্দিশ সম্প্রদায়ের আন্দোলনকারীরা ইরানের একটি ট্রুপের ওপর আক্রমণ করে এবং জাফরকে ৭৬ দিনের জন্য বন্দি করে রাখে। এইসব অভিজ্ঞতা সম্বল করেই জাফর যুদ্ধ-বিষয়ক একটি ডকুমেন্টারি ফিল্ম বানান।
বিস্তারিত পড়ুন

সংখ্যালঘু দর্পন

সাদিক হোসেন

বহুদিন অন্ধকারের পর জ্যোৎস্না ফুটে উঠলে, শিয়াল শাবক যেমন প্রথমবার আসমানে আটকানো সিলভারের থালা দেখে বিহ্বল হয়ে ওঠে, ১৯৯২ সাল তেমনি অন্তত আমার কাছে, একটি জটিল বৃত্ত — আলোহীন, গন্ধহীন, গভীরতাহীন — যেন কতদিনকার পুরোনো খবরের কাগজের ওপর উড পেন্সিল দিয়ে আঁকা একটা গোল দাগ। ১৯৯২ কোনো সংখ্যা নয়; সাল-তারিখ-ইতিহাস-ঘটনার বাইরে, যেন আমার মেধায় এবং চেতনায় এবং শরীরে আলপিন দিয়ে সেঁটে দেওয়া একটা না-ধারাবাহিকতা।
এই মুহূর্তে, ‘না-ধারাবাহিকতা’ শব্দটি লিখেই আমার পেনটা থেমে গেল। ১৯৯২ কি সত্যিই ভারতের সমাজ-রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রেক্ষিতে একটি অঘটন? ৪৬-৪৭, ৫২, ৬৪, ৮৮, ২০০২ — পরপর সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বিপন্ন হয়েছে কত মানুষের জীবন। আমরা সর্বদাই অন্য সম্প্রদায়কে সন্দেহের চোখে দেখি। অদ্ভুত রকমের ঘেন্না যেন আমাদের অস্তিত্বকে সবসময় আঁকড়ে ধরে আছে। সেক্ষেত্রে ১৯৯২-কে তো এক ধরনের ধারাবাহিকতাই বলা যেতে পারে। তা সত্ত্বেও, আমার মনে হয়, ১৯৯২ অন্যান্য সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাগুলোর থেকে খানিকটা আলাদা। ১৯৯২ সাম্প্রদায়িকতাকে এক ধরনের রাষ্ট্রীয় যৌক্তিকতা দিয়েছে, আমাকে বানিয়েছে সংখ্যালঘু।
স্মৃতির ভেতর, অভিজ্ঞতার ভেতর ‘সংখ্যালঘু’ শব্দটি নিয়ে বেঁচে আছি। সচেতনভাবে বেঁচে আছি। এখানে রাস্তাঘাটে, অফিসে, কলেজে কখনো অন্যমনস্ক হওয়ার উপায় নেই। অন্যমনস্কতা সংখ্যালঘুদের মানায় না বলেই এক তীব্র, অসহ্য, নিষ্ঠুর সচেতনতা নিয়ে বেঁচে আছি।
বিস্তারিত পড়ুন

নিয়ন্ত্রিত সমাজ এবং ইন্টারনেট

শমীক সরকার

বছর তিরিশের এডওয়ার্ড স্নোডেন নামে এক মার্কিন যুবক সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মিডিয়ার শিরোনামে। কিন্তু তার শিরোনামে আসার কথা ছিল না। সে মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা সিআইএ-র এক চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী হওয়ার সুবাদে মার্কিন রাষ্ট্রের কিছু গোপন নথির হদিশ জেনেছিল। মার্কিন রাষ্ট্রের গুপ্তচর বৃত্তির কাজে শিক্ষানবিশী যারা করে, তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য বানানো কিছু স্লাইড (ইলেকট্রনিক পোস্টার) সেই গোপন নথি। স্নোডেন সেগুলি ফাঁস করে দেয় আমেরিকার নিউইয়র্ক টাইমস এবং ব্রিটেনের গার্ডিয়ান নামে দুটি বিরাট পত্রিকাগোষ্ঠীর দুই সাংবাদিকের কাছে। সেই পত্রিকাদুটি ওই স্লাইডের কয়েকটি মাত্র তাদের ওয়েবসাইট ও প্রিন্ট সংবাদপত্রে প্রকাশ করে। তাতে দেখা যায়, মাইক্রোসফট থেকে গুগল, ইয়াহু থেকে ফেসবুক — ইন্টারনেটের দুনিয়ার রাঘব বোয়াল কর্পোরেটদের প্রত্যেকটির কেন্দ্রীয় মহাফেজখানা বা সার্ভারে মার্কিন রাষ্ট্র যন্ত্র বসিয়ে রেখেছে। ফলে সারা পৃথিবীর ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের মধ্যে যারা ওই কর্পোরেট কোম্পানিগুলির ওয়েবসাইট ব্যবহার করে তাদের সমস্ত ব্যক্তিগত তথ্যাদি, তারা কোন কোন ওয়েবসাইট দেখেছে, কী কী টাইপ করেছে ইন্টারনেটে, কাদের কী কী ইমেল করেছে, ফেসবুকে কী কী স্ট্যাটাস দিয়েছে বা কমেন্ট করেছে বা কার কার প্রোফাইল দেখেছে — অর্থাৎ প্রকৃত অর্থেই ইন্টারনেটে থাকাকালীন প্রতিটি মাউস ক্লিক এবং প্রতিটি কি-বোর্ড এন্ট্রি, যা জমা হয় ওই কোম্পানিগুলির মহাফেজখানায়, সব চলে গেছে মার্কিন রাষ্ট্রের হাতে। স্লাইডে নাম আছে যাদের, সেই সমস্ত কোম্পানিই আমেরিকান এবং সমস্ত কোম্পানিই তাদের সমস্ত দেশের ব্যবহারকারীর তথ্য মার্কিন দেশে মহাফেজখানায় (কতগুলি ভারী কম্পিউটার) রাখে, কারণ মার্কিন দেশে মহাফেজখানা বা সার্ভার বসানো সস্তা। ফলে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার সুবিধাই হয়েছে। যাই হোক, এসব ফাঁস হয়ে যেতে দুনিয়া জুড়ে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের মধ্যে ঢি ঢি পড়ে যায়। মার্কিন রাষ্ট্রপতি স্বীকার করে নেন, এসব করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও করা হবে।
এই তথ্য প্রকাশ্যে আসার দিনকয়েকের মধ্যে স্নোডেন নিজে প্রকাশ্যে আসে। সে মিডিয়া সাক্ষাৎকারে বলে, সে হংকংয়ে আছে, সে-ই এই ফাঁস ঘটিয়েছে। হংকংয়ের যে হোটেলে সে আছে, সেখানে সে প্রায় পাগলের মতো নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে নিজের জন্য — এমনকী সে হোটেলের দরজায় সার সার বালিশ দিয়ে রেখেছে, যাতে সে ঘরে কী করছে বা কী বলছে, বাইরে থেকে কেউ তা আড়ি পেতে দেখতে বা শুনতে না পারে। বোঝাই যায়, মার্কিন গুপ্তচর সংস্থার হাত থেকে নিজের প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে তার প্রকাশ্যে চলে আসা, যদিও এর ফলে আখেরে যে ক্ষতি হবে বিষয়টির, সে জানত। ওই সাক্ষাৎকারে স্নোডেন বলেছিল, এবার বড়ো মিডিয়া তাকে টপিক বানাবে আর তার ফাঁস করা জিনিস সরে যাবে মিডিয়া থেকে। স্নোডেনের আশঙ্কা সত্যি প্রমাণিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বড়ো মিডিয়া যেন ওঁৎ পেতেই ছিল। সারা পৃথিবীর সমস্ত ইন্টারনেট ব্যবহারকারী মানুষের ওপর মার্কিন রাষ্ট্রের গুপ্তচরবৃত্তির বাস্তবটি নিয়ে আলোচনা সরে গেছে মিডিয়া থেকে। বদলে স্নোডেন সংবাদের শিরোনামে। সে কোথায় যাচ্ছে? তার প্রেমিকা কে? সে কী বলছে? তার বাবা কী বলছেন? সে কোন দেশে পালিয়েছে? কোন কোন দেশের কাছে সে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছে? সেসব দেশের রাষ্ট্রপতিরা কি বলছে? — এইসব চলছে। এমনকী আমাদের বাংলা মিডিয়াতেও চলে এসেছে স্নোডেন কিস্যা। ভারত স্নোডেনকে রাজনৈতিক আশ্রয় না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এই সিদ্ধান্তের নিন্দা করেছেন দিল্লির উঠতি রাজনৈতিক নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল। বামপন্থী এবং মানবাধিকার কর্মীরাও স্নোডেন নিয়ে চিন্তিত। সে চিন্তাও স্বাভাবিক।
বিস্তারিত পড়ুন

নৈরাজ্যের এনকাউন্টার : জুলিয়ান মাইকেল অ্যাসাঞ্জ

রাজ সরকার

Others talk, hope and are repeatedly disappointed, because they don’t understand the true nature of political power. Well I am going to act, I’ve acted. May be I have prevented another world war.
[ওরা কথা বলে, আশা রাখে আর বারে বারে নিরাশ হয়, কারণ ওরা জানে না রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রকৃত স্বরূপ। কিন্তু আমি যা করবার নিজেই করছি, করেছি। হয়তো আজকে আমিই আর একটা বিশ্বযুদ্ধের পথরুদ্ধ করে দিলাম।]
ডঃ এমিল জুলিয়াস ক্লাউস ফুকস-এর ডায়েরি থেকে, ৮ এপ্রিল ১৯৪৫

পাঠক নিশ্চয় বুঝতে পারবেন ডায়েরির ওই তারিখটি হিরোশিমাতে পারমাণবিক বোমা পড়ার দিন। ইতিহাস সচেতন পাঠক মাত্রই বুঝতে পারবেন, বিজ্ঞানে পারমাণবিক বোমার ক্রিটিকাল সাইজ আবিষ্কারের জন্য যেমন ক্লাউস ফুকস অমর হয়ে থাকবেন, তেমনভাবেই অমর হয়ে থাকবেন পারমাণবিক বোমার সূত্র রাশিয়াকে পাচার করে পৃথিবীর ভবিষ্যতের ওপর আমেরিকার আধিপত্য আটকে দেওয়ার জন্য।
সূত্র পাচার মানব সভ্যতার ইতিহাসে সুবিধাজনক হয়েছে কিনা তা তর্কের বিষয়। যা তর্কাতীত তা হল, উপযুক্ত তথ্য কোনো ব্যক্তি, সংগঠন বা রাষ্ট্রের কাছে থাকলে সেই ব্যক্তি, সংগঠন বা রাষ্ট্রকে ঘায়েল করা বড়োই কঠিন। এর প্রমাণ আমরা বিগত সত্তর বছরে রাশিয়া-আমেরিকার ঠান্ডা লড়াইয়ে প্রত্যক্ষ করেছি।
বিস্তারিত পড়ুন

আসগার আলি ইঞ্জিনিয়ার (জন্ম ১০ মার্চ ১৯৩৯ মৃত্যু ১৪ মে ২০১৩)

১৪ মে সকাল আটটা নাগাদ আসগার আলি ইঞ্জিনিয়ার তাঁর মুম্বইয়ের সান্তাক্রুজ ইস্টের বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। বিপত্নীক মানুষটি রেখে গেছেন তাঁর পুত্র ইরফান এবং কন্যা সীমা ইন্দোরওয়ালাকে। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৪। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি অসুস্থ ছিলেন।
রাজস্থানের সালুম্বারে এক দাউদি বোহ্‌রা আমিল (যাজক) পরিবারে তাঁর জন্ম হয়েছিল। বাল্যেই তাঁর পিতা শেখ কুরবান হুসেনের কাছ থেকে তিনি আরবি ভাষা শেখেন। প্রথম জীবনেই তাঁকে কোরানের তফসির (টীকা), তব্‌ইল (সুপ্ত অর্থ), ফিক্‌ (ব্যবহারশাস্ত্র) এবং হাদিস (পয়গম্বরের শিক্ষা ও বাণী)-এর শিক্ষা দেওয়া হয়। পরে অবশ্য তিনি সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে বৃহৎ মুম্বই মিউনিসিপাল কর্পোরেশনে কাজ করেছিলেন। ১৯৭০ সালের গোড়ায় তিনি তাঁর চাকরি থেকে স্বেচ্ছা অবসর নিয়ে নিজের দাউদ বোহ্‌রা সমাজের সংস্কারের কাজে সম্পূর্ণ আত্মনিয়োগ করেন। একই সঙ্গে তিনি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা এবং সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নেন। এই কর্মকাণ্ডের অঙ্গ হিসেবে ১৯৮০ সালে ‘ইন্সটিট্যুট অব ইসলামিক স্টাডিজ’ এবং ১৯৯৩ সালে ‘সেন্টার ফর স্টাডি অব সোসাইটি অ্যান্ড সেকুলারিজম্‌’ প্রতিষ্ঠা করেন। ইসলামে বিশ্বাসী হওয়া সত্ত্বেও তিনি অন্য ধর্মকে শ্রদ্ধা করতেন এবং সমান চোখে দেখতেন। তাঁর লেখা প্রায় পঞ্চাশটি বইয়ে তাঁর এই চিন্তাভাবনা ছড়িয়ে রয়েছে। তাঁরই দাউদি বোহ্‌রা সমাজের কট্টরপন্থীদের হাতে তিনি একাধিকবার নিগৃহীত হয়েছেন। তবু জীবনের শেষদিন পর্যন্ত আসগার আলি ইঞ্জিনিয়ার গোঁড়া ধর্মান্ধদের কাছে কখনো মাথা নোয়াননি।
আসগার আলি ইঞ্জিনিয়ার বেশ কয়েকবার কলকাতায় এসেছিলেন। প্রদ্যুম্ন ভট্টাচার্য ও অলকানন্দা গুহর স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, ১৯৯০ সালে কলকাতায় ‘লোকবিদ্যা কেন্দ্র’র এক সভায় আসগার আলি ইঞ্জিনিয়ার ইসলামের সেকুলার তাৎপর্য্য নিয়ে বলেছিলেন। তিনি সেকুলারিজমের ‘ধর্মহীনতা’র অর্থে বিশ্বাস করতেন না। তাঁর বেশ কিছু লেখা বাংলায় অনুবাদ করে মন্থন সাময়িকীর বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশ করা হয়েছে। এই সূত্রে তাঁর সঙ্গে পত্রিকার যোগাযোগও হয়েছিল। পত্রিকার পক্ষ থেকে প্রয়াত আসগার আলি ইঞ্জিনিয়ারকে জানাই আমাদের প্রণাম।