বাঁধ ভেঙে দাও, ভাঙো!

তিস্তা নদীবাঁধ ও জলবন্টন নিয়ে সাম্প্রতিক এক আলোচনায় বিজ্ঞানী সমর বাগচি একটি প্রশ্ন তোলেন, ইউরোপ আমেরিকাতে প্রচুর বাঁধ ডিকমিশনিং হচ্ছে বছর বছর$ ভারতবর্ষে একটাও বাঁধ ভাঙা হয়েছে কি?সেরকম হয়েছে বলে আমার জানা নেই$আমি ভাবছি, রবীন্দ্রনাথ কত দিন আগে বাঁধ ভাঙার কথা লিখে গেছেন মুক্তধারাতে$ সেখানে শিবতরাইয়ের চাষিদের কথা যা বলা হয়েছে, তা আজকের চাষিদেরও সমস্যা$

এ প্রশ্ন উঠেছিল সেদিন। কারণ আলোচনায় দেখা যাচ্ছিল, ভারত ও বাংলাদেশ দুদেশেরই দেশপ্রেমিক সরকার গ্রামের মানুষকে, বিশেষত বাণিজ্যিক বোরো চাষে নিযুক্ত চাষিদের তিস্তা ব্যারাজ থেকে চাষের জল দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং প্রতারিতও করেছে। কিন্তু তিস্তা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধামুক্ত করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। ইউরোপআমেরিকার যেসব দেশ আমাদের উন্নয়নএর এই পথে উজ্জীবিত করেছিল, তারা ইতিমধ্যে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে উন্মুক্ত করার জন্য বাঁধ ভাঙার কাজ শুরু করেছে। বোরো চাষের মজাটা টের পাচ্ছে আমাদের পাঞ্জাব বা পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানের চাষিরাও। কিন্তু কৃত্রিমভাবে নদীকে আটকে বা মাটির তলা থেকে যথেচ্ছভাবে জল তুলে নিয়ে চাষ করে উন্নতি করার বিপদ এখনও সকলের কাছে স্পষ্ট হয়নি।

তাই দুদেশের রাজনৈতিক নেতারা এখনও উন্নয়নএর গল্প বলে মানুষকে প্ররোচিত করতে পিছপা নয়। তিস্তা জলবন্টন তাই আজও রাজনীতির ইস্যু হয়ে রয়েছে। আমরা এবারের সংখ্যায় এই বিষয়টাতে কিছুটা কথাবার্তা বলতে চেয়েছি।

একই সঙ্গে উত্তরাখণ্ডের বিপর্যয় আমাদের আলোচনায় উঠে এসেছে। উত্তরাখণ্ড চোখে আঙুল তুলে দেখিয়ে দিয়েছে, উন্নয়নএর নামে শত শত ড্যাম আর জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ পাহাড়ের প্রকৃতিকে কীরকম নির্মমভাবে ধ্বংস করে চলেছে।

সময় এসেছে বাঁধ ভাঙার। প্রথমত ভাঙতে হবে আমাদের মনের বাঁধ। আধুনিক শিক্ষার যে প্রলেপটা আমাদের মনকে চোখের সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনাকেও দেখতে দেয় না, আমাদের অনুভূতিতে শেকল পরিয়ে রাখে, উন্নয়নের মাদকতায় আমাদের ভুলিয়ে রাখে, সেই মনের বাঁধ ভাঙার সময় এসেছে।

বিপর্যয়ের একমাস পর কেমন আছে কেদারঘাটির মানুষ

শ্রীমান চক্রবর্তী ও শমীক সরকার

 লাপতা

$ হৃষিকেশের মূল বাসস্টপ লাপতা পোস্টারে ছয়লাপ দেখে চমকে উঠলাম$ কেদারনাথের বিপর্যয়ের যে কথা এতদিন খবরের কাগজে বা টিভিতে জেনেছি, তার সাক্ষাৎ পরিচয় আমাদের হল এইভাবেই$ রঙিন, সাদাকালো, জেরক্স, হাতে লেখা হরেক রকম পোস্টার, বিভিন্ন বয়ান, কোনোটাতে ফ্যামিলি ফোটোগ্রাফ তো আবার কোনোটা কেবল পাসপোর্ট ছবি$ মূল বক্তব্য একটাই কেদারনাথের বিপর্যয়ে হারিয়ে গেছে ছবির মানুষটি, নাম এই, বয়স এই$ সন্ধান চাই$ কোথাও কোথাও সন্ধান দেওয়ার ইনামও লেখা আছে$ এক লক্ষ টাকা অবধি ইনাম তো হামেশাই চোখে পড়ল$ একটা বিজ্ঞাপনও দেখলাম, স্থানীয় একটি ফোটোগ্রাফির দোকানের$ তারা বিনা পয়সায় (ফ্রিতে) কেদারে নিখোঁজ যাত্রীদের সন্ধান চেয়ে পোস্টার বানিয়ে দেবে$ আমাদের যাত্রাসঙ্গী, ছাত্র আন্দোলনের কর্মী কাটোদরের কুমায়ুনি যুবক পঙ্কজ বাওয়ারি বলল, এগুলোর ছবি তুলে রাখো!

$ বাসের জানলা থেকে জঙ্গলের রাস্তার পাশে চরে বেড়ানো কতকগুলো ষাঁড়কে দেখিয়ে পঙ্কজ বলল, ওই বলদগুলোর কোনো মালিক নেই$ উত্তরাখণ্ডে বিজেপি সরকারের আমলে গোহত্যা নিষিদ্ধ হয়েছে$ এখনকার কংগ্রেস সরকার এসে তা বহাল রেখেছে$ ফলে বলদ বেচাকেনা করা যায় না আগের মতো$ কিন্তু বলদ পোষার মতো ক্ষমতা যাদের নেই, তারা কী করবে? তারা বলদগুলোকে বাড়ি থেকে প্রচুর দূরে এনে ছেড়ে দেয়$ যদি বলদ কাউকে দিতে হয়, তাহলে বলদের সঙ্গে তাকে কয়েক হাজার টাকাও দিতে হয়$

বিস্তারিত পড়ুন

তিস্তা নদীর জলবন্টন নিয়ে ভারত-বাংলাদেশ সওয়াল জবাব

 

মোঃ খালেকুজ্জামানের সঙ্গে দেবাশিস সেনগুপ্তের ইমেল সংলাপের সারাংশ (২৪৩১ জুলাই ২০১৩)

এক অববাহিকা থেকে অন্য অববাহিকায় জল স্থানান্তর প্রসঙ্গে

খালেক :আপনার প্রবন্ধ পড়ে ও সংযুক্ত ম্যাপ দেখে যেটা বুঝলাম তা হল যে গাজলডোবা থেকে তিস্তা নদীর প্রায় সব পানিই কৃত্রিম খালের মাধ্যমে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে পশ্চিমে মহানন্দা, মেচী, পুনর্ভবা, আত্রাই সহ অন্যান্য নদীর অববাহিকায় যা কিনা আন্তঃনদী সংযোগেরই নামান্তর$ প্রত্যেক নদীর অববাহিকার পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং সুরক্ষা সেই নদীর অববাহিকাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে এটাই কাম্য, ন্যায়সঙ্গত এবং বিজ্ঞানসম্মত$ অববাহিকাভিত্তিক পানি সম্পদের উন্নয়নই সারা দুনিয়ায় প্র্যাকটিস করা হয়ে থাকে$ এক নদীর পানি অন্য নদীর অববাহিকায় সরিয়ে নিয়ে সেচ এবং পানীয় জলের চাহিদা যদি হিসেব করা হয় (যেমনটা আপনার রিপোর্টে করা হয়েছে), তাহলে শুরুতেই শুভঙ্করের ফাঁকি থেকে যায়$ তিস্তার পানি সরিয়ে ফরাক্কার উজানে যদি গঙ্গার পানি প্রবাহ বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাহলে তিস্তার বর্ষাকালীন পানিও পর্যাপ্ত হবে না$

বিস্তারিত পড়ুন

তিস্তা নদীর পানি বন্টনের রূপরেখা

মোঃ খালেকুজ্জামান

পানির অপর নাম যেমন জীবন, তেমনই বাংলাদেশের অপর নাম নদী$ হয়তো এই সত্যটা বাঙালিরা বরাবরই জানতো, আর তাই সঙ্গত ভাবেই স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রাক্কালে সবার একটি প্রিয় স্লোগান ছিল, তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা, মেঘনা, যমুনা$ বাংলাদেশের ৮০% এলাকাই নদীপ্লাবন ভূমি$ নদীবাহিত পলিমাটির স্তরায়নের মাধ্যমেই কোটি কোটি বছর ধরে বঙ্গীয় বদ্বীপের সৃষ্টি হয়েছে$ আর তাই, বাংলাদেশের প্রতিটি নদীর স্বাস্থ্যের উপরই দেশের প্রকৃতি এবং অর্থনীতির স্বাস্থ্যও নির্ভরশীল$ নদীর গতিপ্রকৃতির উপর নির্ভর করেই প্রতিটি নদীর অববাহিকায় গড়ে উঠে জীববৈচিত্র্য এবং সমাজ ও সভ্যতার সোপান$ সে অর্থে প্রতিটি নদীর অববাহিকার পরিবেশ, প্রতিবেশ, কৃষি, স্য সম্পদ, নৌচলাচল, শিল্পকারখানা, এবং সার্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডই আবর্তিত হয় নদীর প্রবাহমানতা উপর ভিত্তি করেই$তিস্তা নদীর অববাহিকায় বিদ্যমান প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য ও বসবাসরত জনগোষ্ঠীর বেলায়ও এ কথাটি সর্বতভাবে প্রযোজ্য$

বিস্তারিত পড়ুন

তিস্তা জলবন্টন নিয়ে আলোচনাসভার প্রশ্নোত্তর

উত্তরগুলি দিয়েছেন দেবাশিস সেনগুপ্ত।

নদীর অববাহিকা তো সাধারণত উজান থেকে ভাটির দিকে চওড়া হতে থাকে, তিস্তার ক্ষেত্রে অন্যরকম কেন?

নদীর খাত ক্রমশ চওড়া হয় ভাটির দিকে। অববাহিকা সাধারণত ভাটির দিকে সরু হয়, যদি না নিম্নগতিতে নদী শাখাপ্রশাখায় বিভক্ত হয়ে বদ্বীপ তৈরি করে। তিস্তার ক্ষেত্রে এটাই হয়েছে, সে শাখাপ্রশাখায় বিভক্ত না হয়ে নিজেই সোজা গিয়ে ব্রহ্মপুত্রে মিশেছে$

বর্ষা ও শুকনো সময়ে তিস্তার দৈর্ঘ্যে কতটা তফাত হয়?

বর্ষায় নদী যে খাত দিয়ে বয় তা অনেক সোজা, শুকনো সময়ে তার চেয়ে সরু খাত ধরে এঁকেবেঁকে যায়$ দুই দৈর্ঘ্যে কতটা তফাত, নির্দিষ্ট করে বলতে পারব না$ তফাতটা বেশি হয় নদীর নিম্নগতিতে$ সারণিতে তিস্তার যে দৈর্ঘ্য দেওয়া আছে, তা শুকনো সময়ে উপগ্রহের তোলা ছবির ভিত্তিতে মাপা$

তিস্তা থেকে মহানন্দা খালের গতিপথে তো অনেক নদী পড়ে, খাল সেগুলি পেরোয় কীভাবে?

বিস্তারিত পড়ুন

দুটি ব্যারাজ একটি নদী

২৮ জুলাই বিকেল চারটেয় কলকাতার ‘আর্থকেয়ার বুক্‌স’-এ মন্থন সাময়িকী পত্রিকা আয়োজিত সভায় ‘তিস্তা নদীর জল বন্টন’ প্রসঙ্গে আলোচনা করেন দেবাশিস সেনগুপ্ত। তাঁর আলোচনা প্রবন্ধ আকারে প্রকাশ করা হচ্ছে। সভায় যে কথাবার্তা হয়, তা কিছুটা সম্পাদনা করে প্রশ্নোত্তর আকারে আলাদা প্রকাশ করা হল। উত্তরগুলি দিয়েছেন দেবাশিস সেনগুপ্ত। এছাড়া, দেবাশিস সেনগুপ্তের প্রবন্ধ ই-মেল করে আলোচনার জন্য কিছু মানুষকে পাঠানো হয়েছিল। সেই সূত্রে মোঃ খালেকুজ্জমান তাঁর একটি প্রবন্ধ এবং মোঃ নুরুল ইসলাম ও ডঃ কিউ আর ইসলাম যুগ্মভাবে তাঁদের লিখিত মন্তব্য পাঠিয়েছেন। এগুলি প্রকাশ করা হচ্ছে। যেহেতু এই বিষয়টি নিয়ে আমরা একটা সংলাপ চালাতে চেয়েছি, তাই দেবাশিস সেনগুপ্ত ই-মেলের মাধ্যমে এঁদের সঙ্গে কথাবার্তা চালাতে থাকেন। সেই সংলাপও কিছুটা সম্পাদনা করে প্রকাশ করা হল। তবে পত্রিকার বর্তমান সংখ্যা প্রকাশের তাগিদ থেকে এখানে আমাদের আপাতত থামতে হয়েছে। আশা করি, সংলাপে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিগণ এবং পাঠকেরা তাঁদের মতামত ব্যক্ত করে এই আলোচনাকে এক সদর্থক অভিমুখে নিয়ে যেতে উদ্যোগী হবেন।#

tista-debasis

ডিভিসি ও ফরাক্কার পর পশ্চিমবঙ্গের তৃতীয় বড়ো নদী পরিকল্পনা হল তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্প$ তিস্তা নদীর উৎপত্তি সিকিমের কাংসে হিমবাহের মুখ থেকে$ দক্ষিণমুখী হয়ে সিকিমে ১৫১ কিলোমিটার এবং পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত বরাবর ১৯ কিলোমিটার চলে এটি পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করে$ সেখান থেকে জলপাইগুড়ি ও কোচবিহার জেলার ওপর দিয়ে আরও ১২৩ কিলোমিটার এগিয়ে বুড়িগ্রামের কাছে বাংলাদেশে ঢোকে$ তারপর ১২১ কিলোমিটার যাত্রা করে চিলমারির কাছে যমুনা বা ব্রহ্মপুত্রে গিয়ে মেশে (চিত্র ১)$ এই নদী অববাহিকার বিস্তৃতি প্রায় ১২,৩৭০ বর্গ কিলোমিটার$ এর মধ্যে বাংলাদেশে আছে ১৬.৫ শতাংশ, সিকিমে ৫৬.৯ শতাংশ, বাকি ২৬.৬ শতাংশ পশ্চিমবঙ্গে$ কিন্তু অববাহিকার প্রায় অর্ধেক মানুষ থাকে বাংলাদেশের অংশে$ ওই এলাকাটি ঘনবসতিপূর্ণ$ ২০০১ সালের আদমসুমারি অনুযায়ী সেখানে জনবসতি ছিল প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ৯৪০ জন, আর পশ্চিমবঙ্গের অংশে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ৪৪৯ জন$ তখন সিকিমের অংশে জনবসতি ছিল প্রতি বর্গ কিলোমিটারে মাত্র ৭৭ জন$

বিস্তারিত পড়ুন