একটি রাজনৈতিক ফাঁসি

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক নির্মালাংশু মুখার্জীর প্রবন্ধ A Political Hangingএর অনুবাদ তাঁর অনুমতিক্রমে প্রকাশিত হল। বঙ্গানুবাদ করেছেন তমাল ভৌমিক।

এক

তিহার জেলে গোপনে আফজল গুরুর ফাঁসি ও কবর দেওয়ার পর থেকে যেভাবে এই প্রাণদণ্ডের ঘটনা হয়েছে তার জন্য সরকারকে অনেক লেখকই সঠিকভাবে দোষারোপ করছেন। যাই হোক না কেন, একবার যখন রাষ্ট্র একজনকে ফাঁসি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন সেই হত্যাকাণ্ড ণ্ণস্বচ্ছতার সঙ্গে ণ্ণমর্যাদাপূর্ণভাবে হল কিনা সেটা মূলত একটা নন্দনতাত্ত্বিক প্রসঙ্গ। কিন্তু হত্যাকাণ্ড শুরু হল যেপ্রক্রিয়া থেকে তা খুব জরুরি জ্ঞানতাত্ত্বিক আলোচনার বিষয়।

যে সময়ে ও যেভাবে এই ফাঁসিটা দেওয়া হল তা নিঃসন্দেহে সরকারের রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি প্রকট করে তোলে। গ্রেপ্তার হওয়ার শুরু থেকে ক্ষমাভিক্ষার আবেদন প্রত্যাখ্যান পর্যন্ত আফজল গুরুর কেসের সমস্ত ঘটনাকে যদি আমরা খেয়াল করি তাহলে এই রাজনৈতিক বিবেচনাপ্রসূত দুরভিসন্ধির ব্যাপারটা আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রপতি ক্ষমাভিক্ষার আবেদন প্রত্যাখ্যান করার মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে তাঁর ফাঁসি হয়ে যাওয়াটা ওই রাজনৈতিক প্রক্রিয়ারই অবশ্যম্ভাবী পরিসমাপ্তি।

মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণের দুটি অংশ আছে। প্রথম অংশটা হল : ভারতের সুপ্রিম কোর্টে প্রাণদণ্ড ঘোষণা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার প্রক্রিয়া শেষ হয়ে যাওয়া; পরের অংশ হল : ভারতীয় সংবিধানের ৭২()(সি) ধারা অনুসারে তা প্রেসিডেন্টের এক্তিয়ারে চলে যাওয়া। আমার মতে আফজল গুরুর চূড়ান্ত ঘোষণার পিছনে বিদ্বেষপূর্ণ রাজনৈতিক মনোভাব একটা বিরাট ভূমিকা নিয়েছিল। রাজনৈতিক প্রয়োজনে আফজল গুরুকে হত্যা করা দরকার ছিল, তাই এই প্রাণদণ্ড। কিছু লেখক, আমিও তার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত, খানিক আন্দাজে এই সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন। এখন আমার মনে হচ্ছে এই ভাবনাটা আরও খুঁটিয়ে দেখা যায়। সুপ্রিম কোর্টে আফজলের পক্ষের উকিল প্রবীণ আইনজীবী সুশীল কুমার যে দুটো সাক্ষাৎকার দিয়েছেন সেখান থেকেই শুরু করা যায়। আসামী পক্ষের উকিল হিসেবে তিনি এই কেসটাকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন এবং তাঁর মতে এই বিচারটা একদমই গ্রহণ করা যায় না। কেন, তা দেখাটাই গুরুত্বপূর্ণ।

আইনিবিচারের দিক থেকে দেখলে মূল কথাটা হল এই। এমনকী যেদিন আফজল গুরুর ফাঁসি হয় সেদিনও সুশীল কুমার এই কথাটাই ভেবেছেন যে বিশেষভাবে সন্ত্রাসীদের কেসে সিদ্ধান্ত টানা হয় স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে; কারণ সন্ত্রাসবাদীদের মূল পরিকল্পনা ও সংগঠন সব সময়েই রহস্য দিয়ে ঢাকা। তাই এই কেসগুলোকে পোক্ত করতে স্বীকারোক্তি সঠিক প্রমাণ করার জন্য পারিপার্শ্বিক বিষয়গুলোকে সাক্ষ্য হিসেবে দাঁড় করানো হয়। আবার পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যপ্রমাণও দাঁড়িয়ে থাকে স্বীকারোক্তির জোরে। তাতে করে বিচারব্যবস্থার সামনে হাজির করা তথ্যসাবুদে যে কারচুপি করা হয়নি তা বোঝানো যায়।

বিস্তারিত পড়ুন

Advertisements

ফাঁসি ও ফাঁসির দাবি

সৌরীন ভট্টাচার্য

প্রথমেই বলে নেওয়া যাক যে ফাঁসি ও ফাঁসির দাবি দুটো সম্পূর্ণ আলাদা সমস্যা। কোনো একটা অপরাধে কারো ফাঁসি হবে কি হবে না সেটা আইনের প্রশ্ন। দেশের আইনে যদি ফাঁসির বিধান থাকে আর আইনি প্রক্রিয়ায় যদি অপরাধ ফাঁসির যোগ্য বিবেচিত হয়ে থাকে তাহলে ফাঁসি হবে। আইনে এরকম বিধান থাকা উচিত কিনা, তা নিয়ে আলোচনা এবং সে আলোচনায় মতপার্থক্য হওয়া খুবই সম্ভব। শাস্তি হিসেবে ফাঁসি তুলে দেওয়া নিয়ে আলাপ আলোচনা অনেকদিন ধরেই চলছে। বিভিন্ন দেশে চলছে, আমাদের এখানেও চলছে। সে বিষয়ে অন্য সময়ে কথা বলা যেতে পারে। আপাতত যা বলতে চাই তা এই যে ফাঁসি ও ফাঁসির দাবি দুটো আলাদা ব্যাপার। ফাঁসি আইনের ব্যাপার আর ফাঁসির দাবি আবেগের ব্যাপার।
সমস্যা হিসেবে ফাঁসির দাবি নিয়ে আলাদা করে আলোচনা করার কারণ ঘটেছে। কারণগুলোর পুরো তালিকা লিপিবদ্ধ করার দরকার নেই। আর তা হয়তো সব মনে করে করে আমি এখন করতেও পারব না। একটা দুটো বললেই বোঝা যাবে কেন আমি কথাটা তুলতে চাইছি। গত কয়েক বছর আগে আমাদের এখানে ধনঞ্জয় চট্টোপাধ্যায়ের ঘটনা এখনো নিশ্চয়ই অনেকের মনে আছে। যে স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব তার উপরে ন্যস্ত ছিল সেই স্কুলের এক ছাত্রীকে ধর্ষণ ও হত্যা করার অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে। তখনকার মতো আইনি প্রক্রিয়ার শেষে তার ফাঁসির আদেশ হয়েছিল। এই পর্যন্ত প্রশ্নটা আইনের। কিন্তু তার পরে বেশ কিছুদিন ধরে আমাদের এখানে যা ঘটেছিল তাকে বলা চলে রীতিমতো একটা কাণ্ড। তখনকার খবরের কাগজ ওলটালে এখনও তার পরিচয় পাওয়া যাবে। সমাজের বিভিন্ন অংশের মানুষ ধনঞ্জয়ের ফাঁসির দাবিতে এত উদ্‌বেল হয়ে উঠেছিলেন যে সেটা তখন অনেককেই রীতিমতো অবাক করেছিল। এমনকী পশ্চিমবঙ্গের তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী সপরিবার প্রায় যেন প্রচারে নেমে পড়েছিলেন ফাঁসির দাবিতে।
এই ফাঁসির দাবি নিয়ে পক্ষে- বিপক্ষে তখন যা যা ঘটেছিল বা যা বলা হচ্ছিল তা কিন্তু ফাঁসির প্রশ্ন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা একটা ব্যাপার হিসেবে দাঁড়িয়ে গেল। এবং সে ব্যাপারের মধ্যে প্রধান উপাদান ছিল আবেগ। যুক্তি না, বিচারবিবেচনা না, শুধুই আবেগ। এরকম একটা ‘ জঘন্য অপরাধের অপরাধী’র একটাই শাস্তি। তা হল মৃত্যুদণ্ড। একে মৃত্যুদণ্ডের আইনি প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়। তার উপরে মৃত্যুদণ্ড বিষয়ে আধুনিক মনে একটা কুণ্ঠা আছে। এইসব দ্বিধাদ্বন্দ্বই কিন্তু সেদিনের আবেগমথিত পশ্চিমবঙ্গে বা এই কলকাতা শহরে খড়কুটোর মতো ভেসে গিয়েছিল। এতটা তপ্ত আবেগের দিনেও অন্য কণ্ঠস্বর যে কিছু ছিল না বা শোনা যায়নি একেবারে তা কিন্তু নয়। যে ধরনের কথাবার্তা বা অনুভবকে সাধারণত মানবতাবাদী বলে চিহ্নিত করা হয় তা সেদিনও শোনা গিয়েছিল। মানবাধিকার রক্ষার দাবিতে যাঁরা আন্দোলন করেন সেরকম স্বীকৃত কিছু সংগঠনের তরফেও ওই বিতর্কের দিনে অবস্থান নেওয়া হয়েছিল। খানিকটা এইসব বিরোধিতার জবাবেই সম্ভবত আইনি প্রক্রিয়ার তরফে উঠে এসেছিল আর একটা শ্লোগান। ‘Rarest of Rare’, ‘বিরলের মধ্যে বিরলতম’ অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডই বিধেয়। ধনঞ্জয় চট্টোপাধ্যায়ের অপরাধও তখনকার মতো সেই গোত্রের বলে বিবেচনা করা হয়েছিল।
বিস্তারিত পড়ুন

রাজনীতির সাম্প্রদায়িক চরিত্র

একুশে ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গ বাংলা একাডেমি ও অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টসের সামনে ভাষা দিবস নিয়ে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। দেশপ্রিয় পার্কে আর একটি অনুষ্ঠান হয়। প্রথমটিতে ছিলেন সিপিএমের বেশ কয়েকজন নেতা, পরেরটিতে ছিলেন তৃণমূলের নেতৃবৃন্দ এবং স্বয়ং মহাশ্বেতা দেবী। শুনেছি কার্জন পার্কেও একটি সভা হয়েছে। এইসব সভায় প্রথামতো বাংলাদেশের ভাষাশহিদদের স্মরণ করা হয়েছে। কিন্তু সেই ভাষাশহিদদের কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতায় আজ যে গণআন্দোলন চলছে বাংলাদেশের শাহবাগ স্কোয়ারে, তার সামান্য উচ্চারণ পর্যন্ত করা হয়নি।
আসলে বড়ো মিডিয়ার মধ্যস্থতায় রাষ্ট্রের কূট-নীতি নামক বস্তুটার সঙ্গে আমাদের এলিট শিল্পী-সাহিত্যিকরাও বেশ জড়িয়ে পড়েছেন। কিন্তু ভয়ের কথা, এই কূটনীতির সঙ্গেই সহাবস্থান করে আমাদের সাম্প্রদায়িকতা।
একবছর আগে একটা সরকারি নির্দেশ এসেছিল, পাবলিক লাইব্রেরিতে নির্দিষ্ট ১৩টি সংবাদপত্রের মধ্যে থেকেই কেবল সংবাদপত্র কেনা যাবে। এর মধ্যে ছিল দৈনিক স্টেট্‌সম্যান, সংবাদ প্রতিদিন এবং কলম।
আমরা সকলেই জানি, বাম সরকারের আমলে দৈনিক স্টেট্‌সম্যান এবং সংবাদ প্রতিদিন কীভাবে সরকার বিরোধী কার্যক্রমের সংবাদ প্রকাশে বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিল। সরকারের প্রতি বিরূপ মনোভাবের অন্যতম প্রকাশ ঘটেছিল, এই খবরের কাগজগুলোর পাঠকসংখ্যা বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে।
হালফিল একটা খবর পেলাম মেটিয়াব্রুজের একজন খবরের কাগজ বিক্রেতার কাছে। এর আগে মেটিয়াব্রুজে আনন্দবাজার বা দৈনিক স্টেট্‌সম্যানের চেয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল সংবাদ প্রতিদিন। ইদানীং দেখা যাচ্ছে, সংবাদ প্রতিদিনের বাজারটা খেয়ে নিচ্ছে কলম। মেটিয়াব্রুজে কলমের দৈনিক বিক্রি এখন আনুমানিক পাঁচ হাজার।
কলম একটা নতুন পত্রিকা। শাহবাগ আন্দোলনের বিরুদ্ধে এবং জামাত-ই-ইসলামির পক্ষে খোলাখুলি দাঁড়িয়েছে এই পত্রিকা।
জামাত-ই-ইসলামি এক সচেতন রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। দেশভাগের আগে থেকেই এই প্রক্রিয়া চলছে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর তৈরি হল জামাত-ই-ইসলামি হিন্দ এবং জামাত-ই-ইসলামি পাকিস্তান।  বাংলাদেশ গঠনের পরে তৈরি হল জামাত-ই-ইসলামি বাংলাদেশ। প্রক্রিয়াটি কিন্তু অভিন্ন। ১৯৩০-এর দশকে অবিভক্ত ভারতে যখন আধুনিক জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটছে, তখন এই রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার জন্ম, যেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, আমাদের ভূখণ্ডে মানুষের ওপর খোদা ব্যতীত আর কারও শাসন-কর্তৃত্ব থাকবে না।
আমাদের ক্ষমতার রাজনীতি সাম্প্রদায়িক এই অর্থেই যে তা সবসময় ক্ষমতা অর্জনের জন্য নানারকম ভিন্ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে বেপরোয়াভাবে আপোস করতে থাকে। এমনকী, পরস্পরবিরোধী প্রক্রিয়ার সঙ্গেও, যেমন পরস্পরবিরোধী ধর্মীয় মৌলবাদের সঙ্গেও। সেটা যখন সাধারণ মানুষের মধ্যে দাঙ্গার চেহারা নেয়, তখন ওই ক্ষমতার প্রতিনিধিরাই দাঙ্গা থমাতে যায়। এই চক্রে সমাজ আর কতদিন ক্ষতবিক্ষত হতে থাকবে?

বাংলাদেশের জনসমাজে শাহবাগের প্রভাব : কিছু প্রশ্ন

‘বাংলাদেশ : দ্য নেক্সট আফগানিস্তান?’ পুস্তকের লেখক হিরন্ময় কার্লেকারকে আমরা বর্তমান শাহবাগ আন্দোলন নিয়ে কয়েকটি প্রশ্ন করেছিলাম। অল্প সময়ের মধ্যে তিনি যে জবাব পাঠিয়েছেন, সেটা এখানে রাখা হল। বাংলায় তরজমা করেছেন জিতেন নন্দী।

প্রশ্ন : আপনি কি এখনকার শাহবাগের প্রতিবাদকে এক ধরনের সিভিল সোসাইটি বা নাগরিক সমাজের আন্দোলন মনে করেন? আমার জানতে ইচ্ছে করে, গ্রামসমাজের ওপর এর প্রভাব কীরকম? আমার কিছু বন্ধুর মুখে শুনেছি, যেখানে যোগাযোগ ব্যবস্থা খারাপ, সেই সমস্ত প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে এই আন্দোলন দুর্বল।
শাহবাগের প্রক্রিয়াটি নাগরিক সমাজের একটি আন্দোলন। কিন্তু সমস্ত নাগরিক সমাজের আন্দোলনের একই ধরনের শক্তি এবং প্রসার থাকে না। আমরা দেখেছি, এটা ঢাকা এবং অন্য কয়েকটি শহরাঞ্চলে শক্তিশালী। এখনও পর্যন্ত আমি জানি না, গ্রামাঞ্চলে এটা কত শক্তিশালী। কারণ এসব তথ্যের জন্য আমাকে সংবাদমাধ্যমের ওপর নির্ভর করতে হয়। বাংলাদেশ এবং অন্যত্র সংবাদমাধ্যম এই বিষয়ে যথেষ্ট আলোকপাত করেনি। এটা স্পষ্ট বুঝতে গেলে আর একটু সময় লাগবে।
প্রশ্ন : আমি বাঙালি ছাড়া অন্য সমাজ, যেমন চাকমা কোচ রোহিঙ্গা এবং আদিবাসী সমাজের ওপর এই আন্দোলনের প্রভাব কেমন জানতে চাই।
বাঙালি ছাড়া অন্য কৌমসমাজের ওপর এই আন্দোলনের প্রভাব নিয়ে এখনও কোনো তথ্য পাইনি। এই কৌমগুলি জামাতের বিরুদ্ধে। এদের ওপর জামাত প্রায়শই সাম্প্রদায়িক কারণে হামলা করেছে। বৌদ্ধ, মূলত আদিবাসীদের ওপর জামাত সমর্থকদের আক্রমণ, পরে বার্মার রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকায় হিংসাত্মক ঘটনা এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। তাছাড়া, বেগম জিয়া, বিএনপি ও জামাতের তুলনায় শেষ হাসিনা এবং আওয়ামি লিগ জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতি সহনশীল।
বিস্তারিত পড়ুন

শাহবাগ নিয়ে মেটিয়াব্রুজ-মহেশতলায় আলাপ

১০ মার্চ রবিবার বিকেলে রবীন্দ্রনগরে এক ঘরোয়া সভার আয়োজন করা হয়। বিষয় ছিল, চলমান শাহবাগ আন্দোলন। উপস্থিত হয়েছিলেন মোট ১৮ জন, প্রত্যেকেই প্রতিবেশী এবং বন্ধুস্থানীয়। মহেশতলার আকড়া, রবীন্দ্রনগর থেকে শুরু করে মেটিয়াব্রুজের হাজিরতন, বড়তলা, কানখুলি অঞ্চলে এঁদের বাস। প্রসঙ্গত, এতদঞ্চলে পাশাপাশি মুসলমান ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ থাকে। বসবাসের সূত্রে উপস্থিত সকলেরই দুই সম্প্রদায়ের মেলামেশা, বিদ্বেষ ও ধর্মাচরণের প্রত্যক্ষ কিছু অভিজ্ঞতা রয়েছে। সভায় সকলেই খোলামেলা অন্তরঙ্গভাবে কথাবার্তায় অংশ নেন। স্বভাবতই আলোচনা মূল বিষয়কে ঘিরে নানান দিকে বিস্তৃত হয়। আমরা এখানে পুরো তিনঘণ্টার এই আলোচনাকে বেশ কিছুটা সম্পাদনা করে পেশ করলাম।
সকলে সভায় পৌঁছানোর আগেই উপস্থিত বন্ধুদের মধ্যে একটা তর্ক শুরু হয়ে যায়।

ধার্মিক, মৌলবাদী আর নাস্তিক
ফারুক-উল-ইসলাম : মৌলবাদের বিরুদ্ধে কিন্তু শাহবাগ শুরু করেনি। যারা ততটা ধার্মিক নয়, হিন্দু বনাম টুপি-দাঁড়িওয়ালা মৌলবাদী।
সাদিক হোসেন : শুরু করেছিল, রাজাকারদের ফাঁসি নিয়ে। ধার্মিক আর মৌলবাদীর মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে।
ফারুক-উল-ইসলাম : শাহবাগ নিজে বলছে, আমাদের মধ্যেও অনেক ধার্মিক মানুষ আছে। কিন্তু ধার্মিক আর মৌলবাদের মধ্যে পার্থক্যটা এত কম … একটু আগে এক ধার্মিক মহিলার সঙ্গে কথা হচ্ছিল। আমাকে তিনি একটা ছবি দেখালেন। পুলিশ একজনকে পেটাচ্ছে, তার হাতের কোরানটা ছিটকে যাচ্ছে। আমি বললাম, এই ছবিটার একরকমের ব্যাখ্যা আপনি দিচ্ছেন। আপনি বলুন, কোনো লড়াইয়ের ময়দানে আপনি নিজের বাচ্চাকে নিয়ে যাবেন? নিশ্চয় নিয়ে যাবেন না। কারণ আপনি ওই বাচ্চাটাকে ভালোবাসেন, তার ক্ষতি হতে পারে। এই লড়াইয়ের ময়দানে আপনি কোরানশরীফ নিয়ে গেলেন কেন?
শাকিল মহিউদ্দিন : তুমি যেটা বললে ধার্মিক আর মৌলবাদ, মৌলবাদ হচ্ছে ফান্ডামেন্টালিজম্‌, সব ধার্মিক কিন্তু মৌলবাদী নয়। সত্যিকারের ধর্ম বোঝেন মানেই কিন্তু তিনি ফান্ডামেন্টালিস্ট নন। যারা হঠকারি, ধর্মকে ব্যবহার করে ষড়যন্ত্র করে, তারা মৌলবাদী।
সাদিক হোসেন : এখানে আমি একটা অন্য কথা বলতে চাই। আমি যদি বিশ্বাস করি যে আমি জন্মগতভাবে মুসলিম। আমি মুসলিম ধর্মটাকে মনপ্রাণ দিয়ে ভালোবাসি। তার মানে আমার কাছে হিন্দু ধর্ম অতটা বড়ো নয়, বড়ো হলে তো আমি হিন্দুই হয়ে যেতাম। আমার কাছে ইসলাম ধর্মটাই তো শ্রেষ্ঠ। এবারে আমি যখন একটা ধর্মকে শ্রেষ্ঠ বলছি, তখন আমি পরোক্ষভাবে একটা মৌলবাদের ব্র্যাকেটে পড়ে যাচ্ছি। আমি ব্যক্তিগতভাবে এই বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরলে আমার চারপাশের লোকজন তেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। কিন্তু আমার সংখ্যা যদি বেড়ে যায়, তখন মৌলবাদী আর ধার্মিকের পার্থক্যগুলো টানা যায় না।
বিস্তারিত পড়ুন

শাপ-মুক্তি ঘটুক বাংলাদেশের

কৌশিক চক্রবর্তী

১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারির পর ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি। প্রথম ফেব্রুয়ারির সুবাদে পৃথিবী পেয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, যার গর্ভভূমি ছিল বাংলাদেশ। আর, দ্বিতীয় ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশকে পরিচিত করতে চলেছে তার দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের সূচনার প্রেক্ষিতে, যা মৌলবাদকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য নিশ্চিতভাবে আমাদের উদ্বুদ্ধ করবে, অনুপ্রেরণা জোগাবে অদূর ভবিষ্যতেই। ফেব্রুয়ারির ৫ তারিখ থেকে তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে যে জনজাগরণের সূত্রপাতে বাংলাদেশ ক্রমাগত আন্দোলিত, তা দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের সূচক এই কারণেই যে, এই জমায়েত, এই গণজাগরণ স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে মুক্তি চাইছে। সে জন্যই প্রজন্ম চত্বরের যুদ্ধ মৌলবাদ নিয়ন্ত্রিত প্রাতিষ্ঠানিকতার বিরুদ্ধে; এই যুদ্ধ সংকীর্ণ, কূপমণ্ডূক, ধর্মান্ধ, প্রতিক্রিয়াশীল মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে। এই যুদ্ধের লক্ষ্য প্রত্যেক মানুষের মানবিক মর্যাদাকে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত করা, যার আস্বাদ থেকে বাংলাদেশ বঞ্চিত রয়েছে বহুদিন।
সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত বাংলাদেশের যে সংবিধান ১৯৭২ সালে রচিত হয়, তার প্রধান স্তম্ভ ছিল চারটি — গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা। এই সংবিধানের ১২ নং অনুচ্ছেদ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহারকে, রাষ্ট্র কর্তৃক কোনো ধর্মকে বিশেষ মর্যাদা প্রদানকে, কোনো বিশেষ ধর্মের অনুসারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণকে নিষিদ্ধ করে। এমনকী এই সংবিধানে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল গঠনের প্রশ্নেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য হল, ১৯৭২-এর সংবিধান মানুষের মর্যাদা ও অধিকারের ক্ষেত্রে সমতা প্রতিষ্ঠার তাত্ত্বিক রূপরেখা সফলতার সাথে উপস্থাপন করলেও প্রয়োগের প্রশ্নে তা চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়। সকল ধর্মকে সমান রাজনৈতিক মর্যাদা ও সুযোগ দেওয়ার প্রবণতা এই সময় থেকেই লক্ষ্য করা যেতে থাকে। যে কোনো সরকারি অনুষ্ঠানের সূচনা ও সমাপ্তি পর্বে বিভিন্ন ধর্মের পবিত্র গ্রন্থসমূহ থেকে পাঠ করার যে চর্চা তৎকালীন নেতৃবৃন্দ করেছিলেন, তা আসলে কোনোভাবেই ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না। কোনো রাষ্ট্র যখন এভাবে সকল ধর্মকে সমান গুরুত্ব দিতে চায়, তখন তা পরোক্ষভাবে সাম্প্রদায়িক মানসিকতার জন্ম দেয় সবার অজান্তে। নিজের অলক্ষ্যেই রাষ্ট্র আসলে চোখে আঙুল দিয়ে পৃথক পৃথক ধর্মের অস্তিত্বকে চিহ্নিত করে দেয় এ পর্যায়ে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঠিক এই ঘটনাটিই ঘটেছিল। এই ব্যর্থতার ইতিহাস আরম্ভ হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর শাসন-আমল থেকেই। শেখ মুজিবের সরকার ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠাকল্পে সকল ধর্মকে সমান সুযোগ দেওয়ার রাজনৈতিক পন্থা যে মুহূর্তে নিয়েছিল ঠিক তখনই মানুষ চলে গিয়েছিল পেছনের সারিতে — একেবারে গৌণ হিসেবে, ধর্ম উঠে এসেছিল মুখ্য ভূমিকায়। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের কাছে ব্যক্তিই প্রধান, ব্যক্তি মাত্রেই নৈতিক প্রতিনিধি (moral agent) হিসেবে মানবিক মর্যাদার অধিকারী। রাষ্ট্র নৈর্ব্যক্তিক ভাবে এখানে ব্যক্তি-অধিকার রক্ষায় সচেষ্ট থাকে, প্রত্যেক মানুষের বিবেকের স্বাধীনতা রক্ষায় রাষ্ট্রের নিরপেক্ষ দায়বদ্ধতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
বিস্তারিত পড়ুন

তারুণ্যের আহ্বান, আন্দোলনের নাম শাহবাগ

কাজল সেন

মনে পড়ে গেল ১৯৭২ সালের কথা। ২০ ফেব্রুয়ারি ঠিক রাত বারোটায় পৌঁছেছিলাম বুড়িগঙ্গাতীরে ঢাকায়। রাস্তায় নেমেই দেখি দলে দলে কাতারে কাতারে ছেলেমেয়েরা চলেছে, বুকে কালো ব্যাজ, হাতে ফুলের তোড়া নিয়ে। সকলেরই খালি পা। গলায় গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’। ফিরে এসে লিখেছিলাম, ‘ফুলের মিছিল’, মুক্তি পত্রিকায় — ‘মিছিলের ফুলে আর ফুলের মিছিলে ঢাকার রাজপথ একাকার হয়ে গেল — বোঝাই গেল না কতক্ষণ আমি স্তব্ধ হয়ে বিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম, জানি না।’
চার দশক বাদে এবার সহজেই যখন পাশপোর্ট পেয়ে গেলাম, ঠিক করেছিলাম এবার একুশের অনুষ্ঠানে ঢাকাতে থাকব। শ্রীরতন বসু মজুমদারের আশ্বাসে আরও দৃঢ় হল সে বাসনা। ভিসা করলাম। ‘মৈত্রী এক্সপ্রেস’-এ উঠলাম। ঢাকায় পৌঁছেই ‘উদীচী’র আতিথ্যে ১৯ ফেব্রুয়ারি রাতে টিএসসি-র অতিথিশালায় স্থান পেলাম।
তার আগেই প্রেস ক্লাব থেকে আমাকে নিয়ে গেলেন শাহবাগের মোড়ে। তখন সেখানে যে মেয়েটি ধ্বনি দিচ্ছিল (তাকে জোয়ান অব আর্ক মনে হচ্ছিল), কী অপূর্ব জোরালো আবেগমথিত তেজোদ্দীপ্ত তার কণ্ঠস্বর! হাজার পঞ্চাশেক লোক তার সঙ্গে গলা মেলাচ্ছে। শুনলাম তার নাম লাকি আখতার (লাঠি আখতারও হতে পারত)। সে হানাদারদের মার খেয়ে আহত হয়েও দমেনি। আরও বেশি উদ্বুদ্ধ হয়ে সারারাত ধরে ধ্বনি দিয়ে ওই জনতাকে সতেজ রেখেছে, প্রাণিত করেছে, উদ্দীপ্ত ও উজ্জীবিত রেখেছে।
এরকম আরও কিছু ছেলেমেয়ে গোল হয়ে বসে রয়েছে — দিনের পর দিন — রাতের পর রাত। তারা শ্লোগান দিয়ে প্রতিবাদের আসরকে চালু রেখেছে, অনমনীয় মনোভাব নিয়ে গণজাগরণ মঞ্চকে ধ্বনি-মুখরিত করে রেখেছে। টিএসসি অতিথিনিবাসে রাত দুটোর সময়ও শুয়ে শুয়ে সেই ধ্বনি শুনেছি আমি। আমার রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল শাহবাগ প্রজন্ম চত্বর।
বিস্তারিত পড়ুন